আরিফা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন ক্যামেরা (সিসিটিভি) ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, আরিফা কয়েক মাস আগে রবিনকে তালাক দিলেও নতুন করে তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন হয়েছিল। এ কারণেই একসঙ্গে দুজন বাসায় যান। হত্যাকাণ্ডের পর রবিন দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন সেই দৃশ্যও দেখা গেছে ফুটেছে। এতে মনে হচ্ছে, হত্যার উদ্দেশ্যেই আরিফার সঙ্গে রবিন নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছিল।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৪৪ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের সময় আরিফা ফোনে কথা বলতে বলতে বাইরে যান। কয়েক মিনিট পর ৮টা ৪৭ মিনিটে সাবেক স্বামী রবিন সহ আবার বাসার ভেতরে ঢোকেন তিনি। দুজনের হাতেই ছিল ব্যাগ। এরপর দেখা যায়, ৮টা ৫১ মিনিটের সময় দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে রবিন। সিসিটিভির এই কয়েক মিনিটের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, কৌশলে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বাসায় গিয়ে আরিফাকে হত্যা করে রবিন।
আরিফার বড় ভাই আল-আমিন বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রায় চার বছর আগে ইডেন কলেজে পড়ার সময় আরিফা একই এলাকার রবিনকে বিয়ে করেন। গত বছরের জুনে যমুনা ব্যাংকের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ পদে যোগ দেন আরিফা। সর্বশেষ তার কর্মস্থল ছিল যমুনা ব্যাংকের পল্টন শাখায়। অন্যদিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় কর্মী হিসেবে কাজ করতো রবিন। বিয়ের দুই মাস পর থেকেই নানা অজুহাতে আরিফাকে নির্যাতন শুরু করে সে। মাদকাসক্তির অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। নির্যাতন সইতে না পেরে কয়েক মাস আগে রবিনকে বিবাহ বিচ্ছেদের চিঠি পাঠিয়ে দেন আরিফা। এরপর মা আফিফা জামানকে নিয়ে কলাবাগানের ১৩ ওয়েস্ট এন্ড স্ট্রিটের একটি বাসার একতলায় ভাড়া থাকতে শুরু করেন তিনি।
আরিফার ভাই বুলবুল আরও জানান, বিবাহ বিচ্ছেদের চিঠি পাঠানোর পর বিভিন্নভাবে আরিফা ও তাদের হুমকি দিতে থাকে রবিন। এ কারণে তারা কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। কিন্তু আরিফার সঙ্গে রবিন নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল কিনা সেটা তারা জানেন না।
বুলবুল বাদী হয়ে রবিনকে আসামী করে কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কলাবাগান থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সমীর চন্দ্র সুবীরকে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে তারা পর্যায়ক্রমে কথা বলছেন। তবে এখনও রবিনকে তারা ধরতে পারেননি। আশা করছেন, খুব দ্রুত তাকে ধরা সম্ভব হবে। তাকে ধরতে পারলে কী কারণে আরিফাকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি জানা যাবে।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে আরিফার লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন সমীর চন্দ্র সুবীর। সুরতহাল প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ডান চোয়ালে কাটা জখম। বাম কান ছিল ক্ষত-বিক্ষত। ডান কানের পেছনে গলা বরাবর নীচে অনুমান সাড়ে তিন ইঞ্চি কাটা ছিল। ডান হাতের কবজি ও বাম হাতের আঙুলেও ছিল কাটা দাগ। সমীর চন্দ্র মনে করেন, তার ওপর যখন ছুরি নিয়ে আকস্মিক হামলা চালিয়েছিল রবিন, তখন আরিফা সেই হামলা ফিরিয়ে দিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। স্বজনদের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, আরিফা ‘মা’ ‘মা’ বলে চিৎকারও করেছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘাতক পালিয়ে যায়।
শুক্রবার আরিফাকে জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার হাজড়াবাড়ি গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিন ছিলেন সবার ছোট।
এএআর/