চার বছরে পেল না থানা পুলিশ, দুই মাসেই পেল পিবিআই

পিবিআই সদস্যদের হাতে আটক দুই চাঁদাবাজ আলমগীর হোসেন ও মো. সুরুজ মিয়াচাঁদাবাজি মামলার আসামিদের চার বছর ধরে ‘খুঁজে পাচ্ছিল না’ মিরপুর মডেল থানা পুলিশ। এমনকি আসামিদের ঠিকানাও ‘খুঁজে বের করতে পারেনি’ তারা। এই কারণ দেখিয়ে মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে দেন তদন্ত কর্মকর্তা। তবে বাদী নারাজি দিলে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দায়িত্ব পাওয়ার দুই মাসের মধ্যেই প্রধান আসামিসহ দু’জনকে গ্রেফতার করে তারা।
পিবিআই দু’জনকে গ্রেফতারের পরও মিরপুর মডেল থানার ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।’ তবে পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত তারা ওই এলাকাতেই দাপটের সঙ্গে চার বছর ধরে ঘুরে বেড়িয়েছে। গড়ে তুলেছে কাঁচাবাজারের মার্কেট। ওই দু’জনকে গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে ওই মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে।

পিবিআই ও মিরপুর মডেল থানা পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ৯ নভেম্বর মিরপুর মডেল থানার পীরেরবাগ এলাকার সুলতানা আশরাফি নামের একজন নারী বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ওইদিন বেলা ২টার দিকে মধ্য পীরেরবাগের চিহ্নিত সন্ত্রাসী আলমগীরের নেতৃত্বে ৭-৮ জন এসে বাড়িওয়ালার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। বাড়িওয়ালা তাদের তাৎক্ষণিক দশ হাজার টাকা দেন। ১০ নভেম্বর তারা বাকি ৯০ হাজার টাকার জন্য আবারও আসে। বাড়িওয়ালা আর টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে কাঠ, বাঁশ ও টিনসহ ৪০ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে যায়। এমনকি বাড়িওয়ালাকে গুম করে ফেলারও হুমকি দেয় তারা।

পিবিআই জানায়, এ ঘটনায় ৩০ ডিসেম্বর সুলতানা আশরাফি বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন। মামলায় আলমগীর হোসেন, সুরুজ মিয়া ও আব্দুর রহিমসহ আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি মিরপুর মডেল থানার তিনজন কর্মকর্তা তদন্ত করেন। এদের মধ্যে এসআই রাশেদুজ্জামান প্রথমে মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে বাদী নারাজি দিলে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করে মামলাটি ফের তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। তৃতীয় কর্মকর্তা হিসেবে তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে এসআই জুবায়ের হোসেন আসামি আব্দুর রহিমকে গ্রেফতার করেন। তবে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ‘পলাতকদের গ্রেফতার করতে না পারায় এবং নাম-ঠিকানা সঠিক নেই’ উল্লেখ করে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তিনি।

এ বিষয়ে এসআই জুবায়ের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আসামিদের খুঁজে পাইনি। বাদী আমাদের কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করেননি। যাকে পেয়েছি তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছি।’ আসামিরা সবাই এলাকায় ছিল, আপনারা খুঁজে পাননি- বাদীর এমন অভিযোগের বিষয়ে এসআই জুবায়ের বলেন, ‘আমরা যাদের পেয়েছি, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছি।’

এসআই জুবায়ের ওই অভিযোগপত্র দাখিল করার পর গত ফেব্রুয়ারিতে মামলার বাদী আদালতে ফের নারাজি জানান। এতে গত মে মাসে আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেন। বর্তমানে পিবিআই পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থানা পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত। কেবল আসামিদের খুঁজে পায়নি তারা। বাদী নারাজি দিয়ে বলেছেন, আসামিরা এলাকাতেই আছে। আমরা গিয়ে তা-ই দেখলাম। আসামি আলমগীর এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরেক আসামি সুরুজ মিয়া পীরেরবাগ এলাকায় বিশাল কাঁচাবাজার বসিয়েছে। আমরা ৪ জুলাই রাতে তাদের গ্রেফতার করি। এরপর বুধবার তাদের আদালতে হাজির করলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।’

পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আলমগীরের বাবার নাম ইউনুচ আলী। শরীয়তপুরের নড়িয়া থানার গোড়াগাও গ্রামে তার বাড়ি। বর্তমানে ২৯৯/১১ ঝিলপাড়, মধ্য পীরেরবাগ থাকে সে। সুরুজ মিয়া মাদারীপুরের শিবচর থানার নারিকেল বাড়ির জহির উকিলের ছেলে। বর্তমানে মিরপুর মডেল থানার দক্ষিণ পাইকপাড়ার ২১৭/১২ বাসায় থাকেন। তারা পীরেরবাগ এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে নিরীহ জনগণের ওপর দীর্ঘদিন ধরে জুলুম- নির্যাতন করে আসছে। এলাকার নিরীহ মানুষ তাদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না।’ তিনি বলেন, ‘শিগগিরই অন্য আসামিদের খুঁজে গ্রেফতার করা হবে। যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।’

/এএম/এসএমএ/