মশা অনেক ‘চতুর’

ফগার মেশিনের বিকট শব্দ শুনলে মশা পালিয়ে যায়!নগরজুড়ে এডিস মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এই মশা মারার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু তাতে কোনও সফলতা আসছে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফগার মেশিন দিয়ে মশা মারতে লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হলেও মশা মরছে না। এ নিয়ে বেকাদায় রয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।

দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা বলছেন,ফগার মেশিন দিয়ে মশা মারা সম্ভব হয় না। কারণ, মশা অনেক ‘চতুর’। তারা মেশিনটির বিকট শব্দ শুনলেই পালিয়ে যায়। তাছাড়া, ৭০ শতাংশ মশা নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ছাদে তৈরি বাগানে জমে থাকা পানিতে জন্মায়। এসব স্থানে ডিসিসির কর্মীদের ওষুধ ছিটানোর অনুমতি নেই। এ জন্য মশার বংশবিস্তার রোধে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে।

সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীরা বলছেন, বাসাবাড়ির আঙিনা, ছাদ বাগান, নির্মাণাধীন ভবনের চৌবাচ্চা, পরিত্যক্ত ভবন, গাছের কোটর, এসি ও ফ্রিজ থেকে জমা পানি, ফুলের টব,পরিত্যক্ত টায়ার, খালি ক্যান ও ডাবের খোসায় জমে থাকা পানিতে মশার বংশ বিস্তার বেশি ঘটে। এসব স্থানে করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীরা যেতে পারেন না। ফগার মেশিনের শব্দ শুনলেই মশা এসব স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

হস্তচালিত মেশিন মশক নিধনে কার্যকর হলেও এটি দিয়ে বিস্তৃত এলাকায় ওষুধ ছিটানো যায় নাজানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর মুস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আসলেই স্বাভাবিক। যখন একটা বিকট শব্দ হচ্ছে তখন মশা নয়, সব প্রাণীই পালানোর চেষ্টা করে। কোনও মশা একবার ফগার মেশিনের আক্রমণ থেকে কোনোভাবে রক্ষা পেলে দ্বিতীয়বার তারা অনেক সচেতন হয়ে পড়ে। এখন বিষয়টি নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে আমাদের গবেষণা চলছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

মশা নিধনে ওষুধের কোনও সমস্যা নেই বলেও দাবি কর্তৃপক্ষের। সম্প্রতি ঠিকাদারের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনকে মশার ওষুধ সরবরাহের পর তা পরীক্ষা করা হয়েছে। সেসময় ওষধু কেনার দায়িত্বে থাকা দক্ষিণ সিটির ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মুহাম্মদ লুৎফর রহমান তালুকদার বলেন, ‘আসলে মশা অনেক চতুর। তারা ফগার মেশিনের শব্দ শুনলেই সরে গিয়ে বাসাবাড়ির ওপরে অবস্থান নেয়। ওষুধের কোনও দোষ নেই। অনেক ভালো মানের ওষুধ আমরা সংগ্রহ করি। এখন তা যদি মশার গায়ে না লাগানো যায়, তাহলে মশা মরবে কী করে।’

হস্তচালিত মেশিনে ওষুধ ছিটালে সঙ্গে সঙ্গে মশা মরে যায়চিকুনগুনিয়া রোগের অন্যতম বাহক এডিস মশা। নগরজুড়ে মশার উপদ্রবের ফলে এই রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরবাসীর অভিযোগ, মশক নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবহেলার কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সবাইকে সচেতন হয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানায়, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মশা নিধনের জন্য তাদের বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে করা হয় সাড়ে ১২ কোটি টাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) এ বাজেট ছিল ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় করা হয়েছে ১৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এরপরও মশা নিধন করা যাচ্ছে না।

সূত্র জানায়, বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশনে ছয় শতাধিক মশক নিধন কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির পাঁচটি অঞ্চলে মশা নিধনের জন্য ৩০৩ জন স্প্রে ম্যান, ১৪৮টি ফগার মেশিন এবং ২৭১টি হস্তচালিত মেশিন রয়েছে। এর মাধ্যমে মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সমপরিমাণ জনবল ও যন্ত্রপাতি রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটিতেও। হস্তচালিত মেশিনগুলো দিয়ে ওষুধ ছিটানো হলে সঙ্গে সঙ্গেই মশা মরে যায়। কিন্তু এই মেশিন দিয়ে দ্রুত কাজ করা যায় না। আর ফগার মেশিন দিয়ে স্প্রে করা হলে অল্প সময়ে বিশাল এলাকায় ওষুধ ছিটানো সম্ভব। কিন্তু এই মেশিনের বিকট শব্দে মশা আগেই পালিয়ে যায়। যে কারণে কাজে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া, এই যন্ত্রগুলো দিয়ে শুধুমাত্র মাটিতে ফগিং করা হয়। বাসাবাড়ির ভেতরে কর্মীরা যেতে পারেন না। ফলে বেশিরভাগ মশা বাসাবাড়ির ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থা নেয়। যে কারণে এর বংশবিস্তার রোধ করা  সম্ভব হচ্ছে না।

এসএস/এএম /এপিএইচ/

আরও পড়ুন: রাজধানীতে মহামারিতে রূপ নিয়েছে চিকুনগুনিয়া