ধরা-ছোঁয়ার বাইরে জাল রুপি তৈরির হোতা পাকিস্তানি দম্পতি

ভারতীয় জাল রুপি (ছবি- ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)পাকিস্তান-বাংলাদেশ-ভারত—এই তিন দেশের সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে উঠে ভারতীয় জাল রুপি তৈরির প্রতারক চক্র। শুরুতে পাকিস্তানে ভারতীয় রুপি তৈরির কাজ হলেও গত ৮ বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্নস্থানে কারখানা গড়ে জাল রুপি তৈরি করছে এই প্রতারক চক্রটি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সিন্ডিকেটের প্রধান শামসুল হকসহ ৬ জনকে আটক করা হলেও পুরো সিন্ডিকেটের হোতা পাকিস্তানি দানেশ-ফাতেমা দম্পতি রয়ে গেছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন।

তবে এই দম্পতি ও পলাতক কয়েকজনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে এই প্রতারক চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে মনে করছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। তাদের মধ্যে দানেশ অবস্থান পাকিস্তানে ও তার স্ত্রী ফাতেমা বাংলাদেশে রয়েছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। এছাড়া পলাতক রয়েছে অন্তত আরও পাঁচজন। তাদের মধ্যে রয়েছে জামান, ফিরোজ, সবুজ, নূর মোহাম্মদ ও সেলিম রেজা। 

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে,  শুরুতে পাকিস্তানে জাল ভারতীয় রুপি তৈরি করে নিয়ে আসা হতো বাংলাদেশে। এরপর প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা ও ভারতের বাজারে এই জাল রুপিগুলো ছড়িতে দিতো। আর পুরো-প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করতো পাকিস্তানি নাগরিক দানেশ ও তার স্ত্রী ফাতেমা। বাংলাদেশে নিয়মিত যাতায়াত ছিল দানেশের। তবে তার স্ত্রী অধিকাংশ সময় বাংলাদেশেই থাকতো।

২০০৯ সালের দিকে বাংলাদেশেই জাল রুপি ছাপা শুরু করে দানেশ। এরই কয়েকবছর পর মোবাইল ব্যবসায়ী শামসুল হকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। এক পর্যায়ে ভারতীয় জাল রুপির ব্যবসা করার জন্য দানেশ প্রস্তাব দিলে রাজি হয় শামসুল। একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করে তারা। এরই মধ্যে ব্যবসার প্রসারের পাশাপাশি দানেশের কাছ থেকে জাল রুপি তৈরির কৌশলও শিখে নেয় শামসুল। এক সময় বেশ দক্ষ হয়ে ওঠে সে।

ভারতীয় জাল রুপি তৈরিতে পারদর্শী হওয়ার পর দানেশের সঙ্গ ছেড়ে দেয় শামসুল। নিজেই জাল রুপি তৈরি করে নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অঞ্চলে ব্যবসা শুরু করে। ঢাকা, জামালপুর, সিলেট, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া এলাকায় কারখানা গড়ে তোলে তারা।

শামসুল নিজে জাল রুপি তৈরির ব্যবসা শুরুর পর বছর দেড়েক আগে তার সঙ্গে আরও একবার যোগাযোগ করেছিল পাকিস্তানি দানেশ। আবারও একসঙ্গে কাজ করার অফার দেয়। কিন্তু শামসুলের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় আর যোগাযোগ করেনি দানেশ।

এরই মধ্যে গত ১৭ এপ্রিল রাজধানীর আদাবর থানার মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের একটি বাসা থেকে ভারতীয় জাল রুপি তৈরির বাংলাদেশি মূল হোতা শামছুলসহ পাঁচ জন আটক করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা উত্তর বিভাগ (ডিবি উত্তর)। বাকিরা হলো বুলবুল আহম্মদ, খাইরুল ইসলাম, শাহীন আক্তার ও আলমগীর হোসেন। পরবর্তী সময়ে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া থেকে আটক করা হয় আজিজকে।

আটককৃতদের মধ্যে আজিজ ছিল জলছাপ দেওয়ায় পারদর্শী। নিখুঁতভাবে জলছাপ দিতে পারায় দেশের বিভিন্নস্থানে গড়ে ওঠা জাল রুপির কারখানায় অন্যান্য উপাদান তৈরি করা হলেও জলছাপ দিত আজিজ। তার দেওয়া এই জলছাপ এতটাই নিখুঁত যে, রুপি জাল না আসল, তা চেনা মুশকিল হয়ে পড়তো বলে জানান, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার গোলাম সাকলাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি এ-ফোর সাইজ পেপারে ৪টা নোট ছাপাতো তারা। ২ লাখ রুপি বিক্রি করতো ৩০-৪০ হাজার টাকায়। যা পরবর্তী সময়ে সীমান্তে যারা বিক্রি করতো, তারা আরও ৫-১০ হাজার টাকা লাভে বিক্রি করতো।

গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই জালিয়াত চক্রের ছয়জন গ্রেফতার আছে। তবে তাদের মূল হোতা পাকিস্তানি নাগরিক দানেশ ও তার স্ত্রী ফাতেমা। এছাড়া আরও রয়েছে বেশ কয়েকজন। যাদের আমরা খুঁজছি।’ তাদের গ্রেফতার করতে পারলে ভারতীয় জাল রুপি তৈরির চক্রটির আর নতুন করে নোট ছাপানোর সক্ষমতা থাকবে না বলে মনে করেন তিনি।

/টিএন/এমএনএইচ/

আরও পড়ুন: তারা কেন কথা বলেন না?