সন্তানরা ঘুম থেকে জেগে শুনলো ওদের মা নেই

লাইলীর আড়াই বছরের ছেলে আতিকুলপ্রতিরাতের মতো বৃহস্পতিবারও মা লাইলী বেগমের (২৫) বুকে নিরাপদে ঘুমিয়ে ছিল মাত্র আড়াই বছরের আতিকুল। শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার আগে মুন্সী মাইন উদ্দিনের বাড়ির কেয়ারটেকার তোফাজ্জল হোসেন টিপু লাইলী বেগমের ছোট্ট টিনের ঘরের দরজায় ধাক্কা দেয়। ঘুম ভেঙে লাইলী দরজা খুললে টিপু বলে, গৃহকর্তার বাসায় যেতে হবে দ্রুত, রুটি বানাতে হবে। দুই সন্তান আতিকুল ও পাঁচ বছরের মেয়ে মরিয়মকে ঘুমে রেখেই কেয়ারটেকারের সঙ্গে মালিকের বাসায় ছুটে যান লাইলী। এরপর আর সন্তানের কাছে ফিরে আসা হয়নি তার। বাচ্চা দুটি ঘুম থেকে উঠে শুনে তাদের মা আর বেঁচে নেই।

এদিকে, ময়নাতদন্ত শেষে লাইলীর লাশ শনিবার (০৫ আগস্ট) বিকালে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা লাশ নিয়ে লাইলীর গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজার সংলগ্ন সমন্ময় পাড়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। লাইলীর দেবর জামাল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নিহত লাইলীবনশ্রীতে অন্যের বাসায় কাজ করে দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে কোনও রকম দিন পার করছিলেন লাইলী বেগম। তার স্বামী নজরুল ইসলাম অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে প্রায় দেড় বছর ধরে সেদেশের কারাগারে বন্দি। লাইলীর জা আফরোজা বেগম শনিবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লাইলী বিয়ের পর স্বামী নজরুলের সঙ্গে ভারতে গিয়েছিল। সেখানেই দুই সন্তান হয়। এরপর লাইলী দেশে ফিরে আসে। তবে নজরুল সেখানে থেকে যায়। গত দেড় বছর ধরে লাইলী দুই সন্তানকে নিয়ে বনশ্রীতে থাকে। অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালায় সে। এরমধ্যে নজরুল দেশে আসার চেষ্টা করলে ভারতের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে নজরুল ভারতের জেলেই রয়েছে।’

আফরোজা বলেন, ‘লাইলী বনশ্রীর ই-ব্লকের দিকে সোহাগ কোম্পানির টিনশেডের বাসায় ভাড়া ছিল। আমাদের বাসা আরও  ভেতরের দিকে। সকাল ৯টার দিকে আমরা শুনতে পাই, লাইলি কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে। আমি আর আমার স্বামী শহীদুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন পোলাপান নিয়ে দৌড়ে ওই বাড়িতে যাই। কিন্তু কেয়ারটেকার টিপু আমাদের কাউকে ঢুকতে দেয়নি। তখন আমরা চিল্লাচিল্লি করি। এরপর পুলিশ আসে। তখন পুলিশের সঙ্গে আমরা কয়েকজন ওই ফ্ল্যাটে যাই। কিন্তু বাসায় লাইলীকে পাইনি। তারা জানায় লাইলী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এরপর খবর পাই সে মারা গেছে। তখন এলাকার লোকজন সবাই এখানে আসে। কিন্তু পুলিশ আমাদের এখানে দাঁড়াতে দেয়নি।’

বাড়িওয়ালা মুন্সী মইন উদ্দিনপুলিশ গ্রেফতার করার আগে গৃহকর্তা মাইন উদ্দিন দাবি করেন, শুক্রবার সকালে কাজ করতে এসে দরজা লাগিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে লাইলী। এ বিষয়ে আফরোজা বলেন, ‘লাইলীর যদি মরার ইচ্ছা থাকে, এখানে এসে মরবে কেন? তার তো বাসায় জায়গা আছে। বাসায় সে একা থাকে। সে এই বাসায় এসে মরবে কেন? তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। তার এই ছোটছোট দুই বাচ্চার এখন কি হবে? তাদের বাবা নেই মাও নেই।’

আফরোজার পাশেই দাঁড়ানো ছিলেন তার স্বামী নিহত লাইলীর ভাসুর শহীদুল ইসলাম। তিনি লাইলী হত্যা মামলার বাদিও। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই ভারতের জেলে। আমরা গরিব মানুষ। ভাইয়ের বউ মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালায়। শুনছি বাড়িওয়ালা নাইম উদ্দিন তার কয়েক মাসের বেতন দেয়নি। লাইলীকে এতো সকালে ওই বাসায় গিয়ে আত্মহত্যা করবে কেন? এটা আত্মহত্যা নয়। আমি হত্যা মামলা করেছি। আমরা এর বিচার চাই।’

শনিবার বিকালে লাইলীর ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডাক্তার সোহেল মাহমুদ জানান, লাইলীর গলায় ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে এটা হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা নিশ্চিত হওয়া যাবে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর। একই সঙ্গে ভিসেরাও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ময়নাতদন্তের আগে লাইলীর মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন খিলগাঁও থানার এসআই  মঞ্জুর রহমান। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, লাইলীর গলায় ডান দিকে অর্ধ চন্দ্রাকৃতির দাগ আছে। এছাড়া শরীরের কোথায় কোনও দাগ দেখা যায়নি।

কুড়িগ্রামে লাইলীর মায়ের (মাঝে) আহাজারিশুক্রবার রাতেই লাইলীর ভাসুর শহীদুল ইসলাম বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা  করেন। মামলায় গৃহকর্তা মুন্সী মাইন উদ্দিন, তার স্ত্রী শাহানা বেগম, কেয়ারেটেকার তোফাজ্জল হোসেন টিপুর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। ঘটনার পরপরই মাইন ও টিপুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শনিবার দুপুরে গ্রেফতার করা হয় শাহানা বেগমকে। তাদের আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মঞ্জুর রহমান সাতদিন করে রিমান্ড চান। আদালত মাইন ও টিপুর তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এছাড়া, শাহানা বেগমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এসআই  মঞ্জুর রহমান জানান, ‘লাইলী যে ভবনে কাজ করতেন, সেখানে নূরুন্নাহার নামের আরও এক নারী কাজে যায়। ভোরে তারা দুজনেই কাজে ছিল। বাড়িওয়ালা মাইন উদ্দিনের বাসায় কাজে ছিল লাইলী, তার পাশের ফ্ল্যাটে ছিল নূরুন্নাহার। আনুমানিক সকাল ৭টার দিকে মাইন উদ্দিনের বাসায় চেঁচামেচি শুনে নূরুন্নাহার গিয়ে দেখেন লাইলী অচেতন অবস্থায় পরে আছেন। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

এই ঘরে থাকতেন লাইলীনূরুন্নাহার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ওই বাসায় কাজে যায় লাইলী। বাড়িটির দোতালায় বাড়িওয়ালা থাকেন। আমি তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে কাজ করি। আমি ৭টার দিকে সেখানে কাজ করতে যাই। বাড়িওয়ালা আমাকে সকালে তিন তলার ওই ফ্ল্যাটে ডাকতে আসে। সে-ই আমাকে বলে লাইলী মরে গেছে। এরপর আমি তাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি লাইলী খাটের উপর পড়ে আছে। দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। পরে আমাকে আর লাইলীকে প্রথমে ফরাজী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার হুঁশ ফেরে। পরে লাইলীকে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের সঙ্গে বাড়িওয়ালা, বাড়িওয়ালার ছেলের বউ এবং এক কাজের ছেলে ছিল। আমি একটু সুস্থ হওয়ার পর বাসায় আসি। সবাইকে বিষয়টি জানাই।’

তিনি বলেন, ‘লাইলী ভোর ৬টা থেকে রাত ৯ বা ১০টা পর্যন্ত ওই বাসায় কাজ করে। তার মাসিক বেতন ৬ হাজার টাকা। প্রায় তিন মাস ধরে লাইলীর বেতন দেয় না বাড়িওয়ালা। এ কারণে লাইলীর বাসা ভাড়াও বকেয়া ছিল। ধারদেনা করে চলতো সে। কিছুদিন আমার বাসায়, কিছুদিন তার দেবরের বাসায় ছিল। এ নিয়ে সে অনেক দুশ্চিন্তায় ছিল।’

ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শিবলী নোমান শনিবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। আমরা মামলা তদন্ত করছি। তদন্তেই আসল  ঘটনা বের হয়ে আসবে।’

/এআরআর/এএম/

আরও পড়ুন:

লাইলীর গলায় ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে

গৃহকর্মী লাইলী হত্যা মামলায় গৃহকর্তা ও কেয়ারটেকার তিন দিনের রিমান্ডে

মা‌য়ের সঙ্গে ঈদ করা হ‌লো না লাইলীর

লাইলীকে হত্যার বিচার চেয়ে দাশিয়ারছড়ায় মানববন্ধন

বনশ্রীর সেই বাড়িটি এখন ফাঁকা

বনশ্রীর সেই গৃহকর্মীর লাশের ময়নাতদন্ত চলছে

বনশ্রীতে গৃহকর্মী হত্যা মামলা: গৃহকর্ত্রী শাহানা বেগম গ্রেফতার

বনশ্রীতে গৃহকর্মীকে হত্যার অভিযোগে মামলা

গৃহকর্মীর মৃত্যু: থমথমে বনশ্রী