বিসিসিটিএফ-এর অর্থায়নে পাউবো ২০০৯-১০ অর্থবর্ষ থেকে জুলাই ২০১৭ পর্যন্ত মোট ১৪১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এই প্রকল্পগুলোতে মোট অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ১১৩২ কোটি টাকা, যা বিসিসিটিএফ-এর বরাদ্দ করা মোট অর্থায়নের শতকরা ৪০ ভাগ। পাউবো’র ছয়টি প্রকল্প নিয়ে টিআইবি গবেষণা করে। যাতে প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সব পর্যায় বিবেচনায় রাখা হয়।
টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রকল্প কোন এলাকায় বাস্তবায়ন করা হবে, তা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে। যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, প্রকল্পের লোকেশন সেখানেই বেশি। সে অনুযায়ী বিসিসিটিএফ-এর অর্থায়নে পাউবো’র বাস্তবায়িত প্রকল্প সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে, যা শতকরা ২৮ ভাগ। আর সবচেয়ে কম ময়মনসিংহে, শতকরা মাত্র ১ ভাগ। বরিশালে ২২ ভাগ, ঢাকায় ১৯ ভাগ, খুলনায় ১০ ভাগ, সিলেটে ৭ ভাগ, রংপুরে ৬ ভাগ, রাজশাহীতে ৫ ভাগ ও একাধিক বিভাগে প্রকল্প রয়েছে শতকরা ২ ভাগ।
গবেষণার জন্য বিবেচ্য ছয়টি প্রকল্পের মধ্যে চারটি প্রকল্প অনুমোদনে বিভিন্ন পর্যায় থেকে সুপারিশ করা ও প্রভাব খাটানো হয়েছে।এসব প্রকল্পের একটিতে সচিব, একটিতে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রীর আত্মীয় ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং দুটি প্রকল্পের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রভাব খাটিয়েছেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
জলবায়ুর অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে উপেক্ষা করে কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে টিআইবি’র গবেষণায় বলা হয়েছে। এর প্রভাবে প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নিয়ে শঙ্কা এবং বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল্যায়ন, তদারকি ও নিরীক্ষার বিষয়ে সাতটি সেক্টরে অংশীদার রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্থানীয় পাউবো কার্যালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বিসিসিটিএফ, স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ। এদের মধ্যে পাউবো ছয়টি প্রকল্পই পরিদর্শন করেছে। কিন্তু কোনও লিখিত প্রতিবেদন দেয়নি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গবেষণাধীন কোনও প্রকল্পই পরিবীক্ষণ করেনি। মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স ছয়টি প্রকল্পই যাচাই করেছে। কিন্তু দুটি প্রকল্পে উপকরণের নিম্নমানের কারণে নির্মিত অবকাঠামো প্রকল্প চলাকালীন সময়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এই মান যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিসিসিটিএফ ছয়টি প্রকল্পের শুরুতে ও শেষে কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়েছে, তবে শেষ হওয়ার পর মূল্যায়ন হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জন প্রশাসন চারটি প্রকল্প পরিবীক্ষণ করেছে, তবে কোন প্রতিবেদন দেয়নি।
এদিকে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় (বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) কোনও প্রকল্পই নিরীক্ষা করেনি। একইসঙ্গে মূল্যায়নও করা হয়নি।
টিআইবি’র গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, পাউবো’র বাস্তবায়িত জলবায়ু প্রকল্পগুলোতে সুশাসনের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বিদ্যমান। জলবায়ু প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ উন্নয় বাজেটের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় ব্যবস্থাপনার দিক থেকে গুরুত্ব কম পাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন অংশীদারদের যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে।
‘জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন টিআইবি’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (গবেষণা ও জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন) গোলাম মহিউদ্দিন, মহুয়া রউফ, ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মো. রাজু আহম্মেদ মাসুম। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।