হয় যানজটে বসে থাকা, না হয় ‘বিড়ম্বনা’র হাঁটা

যানজটে নাকাল নগরবাসীখিলগাঁও রেলগেট থেকে গুলিস্তান যেতে বিআরটিসির একটি দোতলা বাসে ওঠেন বেসরকারি একটি কোম্পানির কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন ও তার বন্ধু শহীদুল ইসলাম। ভিড়ের বাসে বহু কষ্টে দাঁড়িয়ে থাকার মতো একটু স্থান করে নেন তারা। কিন্তু তীব্র গরমের মধ্যে প্রাণ ওষ্ঠাগত। এর মধ্যেই মাত্র ৩০ গজ সামনে যেতে না যেতেই আমতলা নামক স্থানে প্রায় আধঘণ্টা বাসটি যানজটে দাঁড়িয়ে থাকে। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়েই বাস থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেন সাদ্দাম।

আমতলা থেকে গুলিস্তানে বঙ্গভবন পর্যন্ত হেঁটে আসতে তার ৩৫ মিনিটের মতো সময় লেগেছে। কিন্তু তখনও ছেড়ে আসা বিআরটিসির বাসটি ফকিরাপুল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। বাসে থেকে যাওয়া বন্ধু শহীদুল ইসলাম ফোনে তাকে জানান, বাসটি সামান্য এগিয়ে আরামবাগ ট্রাফিক সিগনালেই আটকে আছে।

এসময় সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তিনি বলেন, ‘সড়কে ভয়াবহ যানজট, বাধ্য হয়েই বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যে এসেছি। নগরীর সড়কের যে অবস্থা তাতে গাড়িতে নয়, পায়ে হেঁটেই বরং দ্রুত আসা যায়। কিন্তু শান্তিতে হাঁটার উপায়ও নেই, সব ফুটপাত তো বেদখল।’

শুধু সাদ্দাম হোসেন নন, নগরীর নিত্যদিনের যানজটে বিরক্ত হয়ে হেঁটেই যাতায়াত করেন অনেকে। এতে কর্মস্থলে বা গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হলেও অন্তত বাসের আগে পৌঁছানো যায়।  সেজন্য অনেকেই আজকাল আর গাদাগাদি করে বাসে উঠতে চান না। বিড়ম্বনার হলেও পায়ে হেঁটেই চলার চেষ্টা করেন।

সাম্প্রতিক সময়গুলোতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কজুড়ে তীব্র যানজট। এতে বাধ্য হয়েই হাঁটতে শুরু করেন যাত্রীরা। কিন্তু তাতেও বিপত্তি, অধিকাংশ ফুটপাতই বেদখল হয়ে আছে। ইচ্ছে থাকলেও ফুটপাত দিয়ে চলাচলের উপায় থাকে না। পুরুষরা কষ্ট করে চলাচল করলেও নারীরা প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হন। এ থেকে মুক্তি পেতে যানজট নিরসন ও ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করে চলাচল উপযোগী রাখার দাবি নগরবাসীর।

পান্থপথের বাসিন্দা ফয়সাল খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসে যেতে হয়। কিন্তু বাসা থেকে বের হলেই জ্যাম। রিকশায় উঠলেও ভাড়া বেশি। রোদ আর বৃষ্টির মধ্যেই বসে থাকতে হয়। এখন আর গাড়িতে উঠি না। কষ্ট হলেও হেঁটে অফিসে চলে যাই।’

গত বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মৎস্য ভবন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের কোথাও তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই। ফুটওভার ব্রিজ ছাড়া রাস্তার এপার থেকে ওপারেও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ট্রাফিক সিগন্যাল অতিক্রম করা যাচ্ছে না। একপর্যায়ে মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত জ্যামের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় সব ক’টি বাসই ফাঁকা হয়ে যায়। জ্যামে আটকে পড়া যাত্রীরা বিরক্ত হয়েই বাস ছেড়ে নেমে হাঁটা ধরেছেন। আর চালকরা ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে রয়েছেন, কখন ছাড়বে জ্যাম সেই অপেক্ষায়।

সড়কে প্রতিদিনই এমন যানজটে আতঙ্কে থাকেন বাসচালক ও কন্ডাকটররা।  এ কারণে যাত্রীরা বাসে ওঠামাত্রই ভাড়া আদায় করে নেন কন্ডাকটর ও হেলপাররা। ফলে গন্তব্যে না পৌঁছেও ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। এ নিয়ে যাত্রী ও হেলপারদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।

তবে নগরজুড়ে এমন যানজটের বেশকিছু কারণ উল্লেখ করেছে ট্রাফিক পুলিশ। মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, রাজধানীর ২০-৩০টি পয়েন্টে ইন্টারসেকশনের কারণে যানজট লেগে থাকে। এ কারণে কখনও কখনও সড়কের একপাশে তীব্র জট দেখা যায়। আবার কোথাও কোথাও যানজট দেখা গেলেও অনেক স্থানে দেখা যায় ফাঁকা।

ট্রাফিক পুলিশের দেখানো কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা, রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, রাস্তার স্বল্পতা, ইন্টারসেকশন, লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি, মাত্রাতিরিক্ত রিকশা ও যানবাহন, সড়কের অপ্রশস্ততা, রাস্তায় আবর্জনার কনটেইনার রাখা ইত্যাদি।

জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মোসলেহ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজধানীতে যে পরিমাণ মানুষ ও যানবাহন রয়েছে সে পরিমাণ সড়ক নেই। সড়কের আয়তনের তুলনায় যানবাহন অনেক বেশি। গাড়ি যদি সমান তালে চলাচলের মধ্যে না থাকে তাহলে যানজট দেখা দেয়। এর মধ্যে যদি প্রধান সড়কগুলোর কোথাও কোনও প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়, তখন এই প্রতিবন্ধকতার মাশুল পুরো নগরবাসীকেই ভোগ করতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত বৃষ্টি হলেই নগরীর বেশ কয়েকটি পয়েন্ট পানি জমে যায়। তখন সেসব স্থানে যানবাহনের গতি স্লো হয়ে পড়ে। সবগুলো গাড়ি এক সঙ্গে না আসতে পারায় কোথাও তীব্র জ্যাম, আবার কোথাও রাস্তা ফাঁকা দেখা যায়। সড়কের ইন্টারসেকশনগুলোর কারণেও যানজট ও ফাঁকা রাস্তার সৃষ্টি হয়।’

আরও পড়ুন: 

৫ দিন পর ব্যাংক কর্মকর্তাকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা