গায়ের রঙ যেমনই হোক, একটু সাজিয়ে না নিলে কী হয়! গলায় ঝুলবে কাপড় কিংবা জরির লাল-হলুদ ঝলমলে মালা, সঙ্গে ঘণ্টি, ঘুঙুর। মালা পরে শিঙ বাঁকিয়ে টুংটাং শব্দ তোলে রাজপথে ছুটে চলা ষাঁড়– দেখতে কার না ভালো লাগে। কালো, লাল, সাদা বা মিশ্র– গায়ের রঙ যেমনই হোক, কোরবানির পশুটি একটু সাজিয়ে নিলে তা ক্রেতার চোখে পড়বে সহজেই। আর ক্রেতার পছন্দ মানেই তো কাঙ্ক্ষিত মূল্যে বিক্রির সম্ভাবনা।
ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা থেকেই হাটে তোলার সময় অনেক বেপারি কোরবানির পশু কাপড়ের মালা,ফুল ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়ে নেন। অনেকে গরুকে রঙিন দড়ি দিয়ে বাঁধেন। ক্রেতা-বিক্রেতার এ আগ্রহের কথা মাথায় রেখে পশুর হাটে বসে এসব পণ্যের অনেক দোকানও।
রাজধানীর পশুর হাটগুলো ঘুরে দেখা যায়, হাটের পাশে পশু সাজানোর এসব জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছে অনেক অস্থায়ী দোকান। এসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে কাপড় ও জরি দিয়ে তৈরি মালা ও ফিতা, মাথা ও শিঙে পরানোর ফুল, গলার জন্য ঘণ্টা ও বেল্ট, গলা ও পায়ে পরানোর জন্য ঘুঙুর, বিভিন্ন রঙের দড়িসহ সাজানোর সব ধরনের সরঞ্জামাদি। পাওয়া যায় বাঁশ বা বেতের লাঠিও। অস্থায়ী দোকানের পাশাপাশি এসব জিনিস বিক্রি করছেন ফেরিওয়ালারাও।
দোকানি ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করেই এই মৌসুমি ব্যবসাটি চলে। কোরবানির পশুর হাটের সময় দুই সপ্তাহের মতো ব্যবসা করে দোকানদাররা ভালোই আয় করেন।
গাবতলী গরুর হাটে এমনই একজন অস্থায়ী দোকানি জামাল উদ্দিন। ভোলার জামাল থাকেন মিরপুরে। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি পশু সাজসজ্জার এসব জিনিসপত্র বিক্রি করছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, মিরপুর ১২ নম্বরে এসব জিনিস তৈরির ছোট ছোট একাধিক কারখানা রয়েছে। সেখান থেকে এসব কিনে এনে তিনি বিক্রি করেন। অনেক কারখানার লোকও গরুর হাটে এসে এগুলো সরবরাহ করে যায়।
পশু সাজানোর জন্য তার কাছে বিভিন্ন রঙের ১৬ আইটেমের জিনিসপত্র রয়েছে উল্লেখ করে জামাল বলেন, ‘গরু বিক্রেতারাই চাহিদা অনুযায়ী এগুলো কিনে নেন। অনেকে নিজের থেকে রঙ পছন্দ করেন, আবার অনেকে গরুর রঙ জানিয়ে এর সঙ্গে কোন রঙ ম্যাচিং হবে সেই পরামর্শ নিয়েও এগুলো কেনেন।’ কোনও কোনও ক্রেতা গরু কেনার পর তা বাসায় নেওয়ার আগে সাজিয়ে নেন বলেও জানান তিনি।
গাবতলী হাটের চা বিক্রেতা আবদুল মান্নান তার চায়ের দোকানেও গরু সাজানোর জিনিসপত্র তুলেছেন। তিনি জানান, প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় তিনি এগুলো বিক্রি করেন। এতে ভালোই আয় হয় তার।
প্রায় ২০ বছর ধরে গরু সাজানোর জিনিসপত্র করছেন শাহজাহান। তিনি জানান, প্রথমে আমরা দুই-তিনজন এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। এখন অনেকেই এটা বিক্রি করে। প্রতি বছরই বিক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। তিনি জানান, তারা কয়েকজন মোটামুটি সবসময়ই এগুলো বিক্রি করেন। এছাড়া, কোরবানির ঈদের সময় তাদের পাশাপাশি কিছু ফেরিওয়ালা ও পান দোকানদারও তাদের মূল ব্যবসার পাশাপাশি এগুলো বিক্রি করেন। অন্যান্য সময় সাপ্তাহিক হাটের দিনে কমবেশি বেচাকেনা হয় বলেও জানান তিনি।
মেরুল বাড্ডার আফতাবনগর বালুর মাঠ কোরবানির পশুর হাটে ফেরি করে পশু সাজানোর জিনিসপত্র বিক্রি করছেন আক্কাস আলী। তিনি জানান, পূর্বপরিচিত একজনের পরামর্শ নিয়ে তিনি এবারই প্রথম এই ব্যবসা করছেন। বেচাকেনা ভালো বলে জানান তিনি।
গাবতলী হাটের গরুর ব্যবসায়ী বগুড়ার ছেয়ারউদ্দিন বলেন, ‘ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার লক্ষ্যেই তারা গরু সাজিয়ে থাকেন।’ এটা করে আদৌ ফল হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, ‘সেটা আসলে বলা মুশকিল। তবে, গরু কেনার সময় অনেক ক্রেতার সঙ্গে তাদের ছোট সন্তানেরা আসে, তারা এগুলো দেখে আকৃষ্ট হয়। এতে অনেক সময় পশু দ্রুত বিক্রি হওয়ার পাশাপাশি দামেও কিছুটা প্রভাব পড়ে।’
আরেক বিক্রেতা মেহেরপুরের সুরুজ মিয়া জানান, ‘অন্য ব্যাপারিদের দেখাদেখি আমিও আমার গরুগুলো সাজিয়েছি। এতে লাভ হবে কিনা জানি না, তবে দেখতে তো ভালোই লাগছে।’