কোরবানির পশুর চামড়া থেকে কওমি মাদ্রাসার যেমন আয় হয়

কোরবানির পশুর চামড়াকোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে অর্জিত অর্থ কওমি মাদ্রাসাগুলোর অন্যতম আয়ের খাত। এই খাত থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে প্রত্যেকটি মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ব্যয় করা হয়। এতিম, হতদরিদ্র শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য প্রতি বছরই প্রত্যেকটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ঈদের দিন ভোর থেকে বিকাল পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। ঈদের দিনে সংগৃহীত চামড়ার আয় দিয়ে ছোট-বড় মাদ্রাসার দুই থেকে সাত-আট মাস পর্যন্ত বোর্ডিংয়ের খরচ নির্বাহ করা যায়। কওমি মাদ্রাসার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। 

কওমি মাদ্রাসার আলেমরা জানান, কোরবানির ঈদের সময় মাদ্রাসার ছুটি বন্ধ থাকে। শিক্ষকদের সমন্বয়ে রেখে এলাকাভিত্তিক চামড়া সংগ্রহ করা হয়। পরিণত সব ছাত্রকেই চামড়া সংগ্রহে যেতে হয়। কোরবানির চামড়া সংগ্রহে তিন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকরা। এই তিনটি পদ্ধতি হচ্ছে, বিনামূল্যে পুরো চামড়া সংগ্রহ, অর্ধেক দামে চামড়া কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি এবং পুরো দামে চামড়া কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি। 

জানা গেছে, মাদ্রাসাগুলোর প্রথম চেষ্টা থাকে কোরবানির পশুর পুরো চামড়াটি সংগ্রহ করা। এক্ষেত্রে যার পশু, ঈদের দিন তার পশুটি কোরবানি করতে সহযোগিতা করা হয়। এজন্য মাদ্রাসার পক্ষ থেকেই ছুরি, চাপাতি নিয়ে ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়ে মাদ্রাসার ছেলেরা। আগে থেকেই এলাকা ভাগ করে সিনিয়র একজন ছাত্রের নেতৃত্বে ছোট ছোট দলে মহল্লায়-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে তারা। প্রথমে পশু কোরবানি করে পুরো চামড়াটি সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। এতে কোরবানিওয়ালা সম্মতি না দিলে অর্ধেক মূল্যে ক্রয়ের চেষ্টা করা হয়। এতেও না হলে চামড়াটি কিনে নেওয়া হয় পুরোদামেই। পরে কিছু বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। চামড়া কেনার জন্য মাদ্রাসার পক্ষ থেকেই লগ্নি করা হয়। এছাড়া কিছু প্রতিষ্ঠান পোস্টার ছাপিয়ে কোরবানির চামড়া সংগ্রহে সমর্থ মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানায়। 

কওমি মাদ্রাসাগুলোর দায়িত্বশীলরা বলছেন, ‘কোরবানির চামড়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে সব সময় একই মূল্য পায় না প্রতিষ্ঠানগুলো। এক্ষেত্রে বড় মাদ্রাসাগুলো চামড়া বিক্রি করে চার থেকে আট মাস অবধি লিল্লাহ বোর্ডিং চালাতে পারে। আর ছোট মাদ্রাসাগুলো গড়পড়তা দুই থেকে তিন মাসের বোর্ডিং খরচ তুলতে পারে।’ 

রামপুরা নতুনবাগের জামিয়া আরাবিয়্যা দারুল উলূম মাদ্রাসার হাদিসের শিক্ষক মাওলানা অলিউল্লাহ আরমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মাদ্রাসায় এক থেকে দুই মাসে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের খাবারের খরচটা উঠে যায়। এতে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা হয়। এটা মূলতই ছাত্রদের বোর্ডিংয়ে ব্যয় হয়।’

বারিধারা জামিয়া মাদানিয়া মাদ্রাসার একজন শিক্ষক জানান, এই মাদ্রাসায় প্রায় এক হাজারের বেশি চামড়া সংগ্রহ হয়। 

কোরবানীর চামড়া সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে একটি মাদ্রাসার পোস্টার

রাজধানীর জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড়কাটারা মাদ্রাসার কোরবানি চামড়া থেকে ছাত্রদের দুই মাসের খাবারের খরচ হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণে চামড়া সংগ্রহের হার কমে গেছে, বলে জানান মাদ্রাসাটির শিক্ষক মুফতি আনসারুল হক ইমরান। তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে এখন মাদ্রাসার চামড়া সংগ্রহের হার কমেছে। বিগত বছরে মাত্র ৮ লাখ টাকা এসেছে চামড়া থেকে। চামড়া সংগ্রহ একটি কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া কিন্তু বাজারে চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো আগ্রহ নেই মাদ্রাসাগুলোর।’ 

মুগদা, মানিকনগর জামিয়া মাহবুবিয়া ইসহাকিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা ইমরানুল বারী সিরাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা হচ্ছে জাতির মাদ্রাসা। আমি বহু বছর ধরেই গ্রামের বাড়িতে কোরবানির ঈদ করতে পারি না। কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করে লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে এতিম-অসহায়দের খাবারের খরচ তোলার জন্য কাজ করি। আবার বিষয়টা এমন না, যে ছাত্ররা কোরবানি করলেই চামড়া দিতে হবে। আমরা অনুরোধ করি। আমাদের মাদ্রাসার আশেপাশে এলাকাতেই আমরা কোরবানির চামড়া সংগ্রহ করি।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা ও জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মুহাম্মদপুর সাত মসজিদ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুযূল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়া কালেকশান করে প্রাপ্ত আয় লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ব্যয় করা হয়। আয়টা একেক মাদ্রাসার একেকরকম। এক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ মাসের খাবার খরচ ওঠে। এই খাবারগুলো গরীব, এতিমদের খাওয়ানো হয় বিনামূল্যে। আবার যারা টাকা দিয়ে পড়াশোনা করে এবং শিক্ষকসহ সবাই কিন্তু লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে যে খাবার সেগুলোই খায়। সেক্ষেত্রে তাদের খরচ বোর্ডিংয়ে জমা হয়।’ 

মাওলানা মাহফুযূল হক আরও বলেন, ‘কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য গত বছর থেকে দাম অনেক কমে গেছে। এবছরও শুনছি আরও কম হতে পারে।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্যানার্স এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ বলেন, ‘এলাকায় এলাকায় গিয়ে সাধারণত ট্যানারি মালিকরা সরাসরি চামড়া কেনে না। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীসহ অনেকে চামড়া কেনেন তারা ট্যানারির কাছে চামড়া বিক্রি করে। অনেক মাদ্রাসাও চামড়া বিক্রি করতে আসে। কিছু কিছু বড় মাদ্রাসা আছে যাদের কালেকশন ভালো হয়, তারা সরাসরি আমাদের কাছে চামড়া বিক্রি করে। তবে এমন মাদ্রাসার সংখ্যা সীমিত।’