জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দফতরের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে প্রতিবছর দেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, আসল সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। সরকারি হাসপাতালে আত্মহত্যা চেষ্টার কেস লিপিবদ্ধ করা হলেও ক্লিনিকে এসব কেস ধামাচাপা দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। যথাযথ মানসিক চিকিৎসার অভাবে এই বেঁচে যাওয়া মানুষটিই আবারও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
বর্তমান সময়ে আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের পরিবর্তন, মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এমনকি নারী ক্ষমতায়নের কারণে নারীরা সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মিলাতে পারছেন না। এমনকি বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে যৌন-সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য হওয়া কিংবা স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্কের ফলে গর্ভধারণের কারণেও অনেক নারীই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। মনোচিকিৎসকদের মতে, আত্মহত্যার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী ডিপ্রেশন। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপে থাকা নারীরা সবকিছুকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে শুরু করেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘শিশুবর্ধন ও পারিবারিক সম্পর্ক’ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. হেলালউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষ অতি তুচ্ছ কারণেও আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বর্তমানে রোজকার জীবনযাপনের যে বৈষম্য, তাতে মানসিক চাপ তৈরি হয়। কিন্তু তা কমানোর মতো সামাজিক উপকরণের ঘাটতি আছে।’ সামাজিক উপকরণ বলতে তিনি কোন জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করতে চান, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ অনেক বেশি নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে। আজকে এসে আত্মহত্যার ধরন ও কারণে পরিবর্তন এসেছে।’
মানসিক চাপ প্রশমিত হবে এমন কনসালটেন্সির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার নেই উল্লেখ করে মনোচিকিৎসক মোহিত কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নিয়মিত কারও সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলা গেলে চাপ কম হয়। এই শেয়ারিংটা চিকিৎসকের সঙ্গেও হতে পারে। কারণ মানসিক টেনশনের জন্য কেবল কথা বলা সমাধান নাও হতে পারে, ড্রাগ লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রবণতা হলো, মনোচিকিৎসকের কাছে গেলেই মাথার সমস্যা হয়েছে মনে হতে পারে। তাই তারা এভয়েড করেন।’
সম্প্রতি প্রাত্যহিক জীবন থেকে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ কমানোর বেসরকারি উদ্যোগ আনন্দময়ী নিয়ে কাজ করছেন নারী অধিকারকর্মী নাহিদ সুলতানা। তিনি বলেন, ‘নারীর জীবন সংগ্রাম নিয়ে তৈরি হওয়া চাপের জায়গাগুলো জমতে জমতে একটা নেগেটিভ এনার্জি তৈরি হয়। চাপ রিলিফের জন্য নারী তার নিজের মতো করে একটা সময় কাটাবে, কাছের মানুষ খুঁজে নিয়ে সমস্যাগুলো আলাপের জন্য বিশ্বাস তৈরি করতে পারবে, এমন কোনও পরিবেশ আমাদের এখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তৈরি করে দেওয়া যায়নি। আনন্দময়ী সেই জায়গায় কাজ করবে।’