তাজিয়া মিছিল: প্রস্তুত হোসেনি দালান

 

তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় হোসেনি দালানে দর্শনার্থীদের মাঝে চলছে পুলিশি তল্লাশি মুসলিম বিশ্বে ত্যাগ ও শোকের একটি দিন পবিত্র আশুরা। কারবালায় হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের মৃত্যুর দিনটি (১০ মহররম) বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা পালন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশেও আগামীকাল রবিবার আশুরা পালিত হবে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে প্রতিবছরই রাজধানীর হোসেনি দালান ইমাম বাড়া থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল। যে মিছিলে শোকের স্মৃতি স্মরণে অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ। আর এ মিছিলের জন্য হোসেনি দালানে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর হোসেনি দালান থেকে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হয় এই আশুরা। আয়োজনের মধ্যে  অন্যতম  তাজিয়া মিছিল। এ মিছিলে পুরো কারবালার শোকের আবহ তুলে ধরা হয়।  তাজিয়া মিছিল আয়োজনের মূল দায়িত্ব পালন করে হোসেনি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। হোসেনি দালান ছাড়াও রাজধানীর পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের বিবিকা রওজা, পুরানা পল্টন, মগবাজার, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও মিরপুর ১১ নম্বরে বিহারি ক্যাম্পগুলোয়  নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আশুরার পালিত হয়। বের করা হয় তাজিয়া মিছিল।

হোসেনি দালান ইমাম বাড়া থেকে  তাজিয়া মিছিল আয়োজন প্রসঙ্গে  হোসেনি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. আসিফ বলেন, ‘আশুরার দিন সকাল সাড়ে ৯টায় তাজিয়া মিছিল বের হবে।  প্রতি বছরের মতো এবারও তাজিয়া মিছিলে অংশ নেবে হাজারও মানুষ।  মিছিলটি নিউমার্কেট হয়ে ধানমন্ডি লেকে গিয়ে শেষ হবে।’ তিনি বলেন, ‘১০ দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আশুরা পালিত হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ইমাম বাড়ায় আসে।’

হোসেনি দালানে চলছে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি
জানা গেছে, তাজিয়া মিছিলের মূল লক্ষ্য কারবালার ইতিহাস উপস্থাপন ও শোক প্রকাশ।  মিছিলে বুক চাপড়ে, জিঞ্জির দিয়ে শরীরে আঘাত করে  মাতম করে অনেকেই। তবে বিগত দুই বছর ধরে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের নির্দেশনা অনুসারে  জিঞ্জির দিয়ে শরীরে আঘাত করা হয় না। তাজিয়া মিছিলের শুরু ভাগেই দু’টি কালো গম্বুজ বহন করা হয়। এ দুই গম্বুজ বহন করা হয় বিবি ফাতেমার স্মরণে। মিছিলে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে এগুতে থাকে।  শোকের গান গাওয়ার জন্য  অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একদল থাকেন।তাদের সঙ্গে বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম করেন অন্যরাও।  এছাড়া মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন নিশান নিয়ে আসেন। যে যার মতো এই নিশান বহণ করেন। মিছিলে দুইটি ঘোড়া থাকে, এর মধ্যে একটি রঙ দিয়ে রক্তের রূপ দেওয়া হয় । ইমাম হোসেন যখন কারবালায় যান তখন এক রকম থাকে, আবার যুদ্ধের শেষে রক্তে ভেজে ঘোড়া এই অবস্থান তুলে ধরা হয় এরমধ্য দিয়ে। মিছিলে বহন করা হয় ইমাম হোসেন (রা.)-এর সমাধির আদলের প্রতিকৃতি।

২০১৫ সালে আশুরায় তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় হোসেনি দালানের সামনে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। বোমা হামলায় একজন নিহত ও প্রায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এরপর থেকেই কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে পুরো হোসেনি দালান ঘিরে রাখে পুলিশ ও র‌্যাব। হোসেনি দালানের প্রবেশ মুখে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করা হয়। 

বৃহস্পতিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ইমামবাড়ায় পবিত্র আশুরাকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। ওই সময় আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘তাজিয়া মিছিল শুরু হলে সেটাকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা হবে। মিছিলটা চারপাশ দিয়ে ঘিরে রাখবে পুলিশ, যেন মাঝখান থেকে কেউ ঢুকতে বা বের হতে না পারে। যে যে রুটে মিছিল হবে, সব রোডে পুলিশ ব্যারিকেড থাকবে ও পাহারা থাকবে। গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। সব অপতৎপরতা বন্ধে আগে থেকেই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।’

আছাদুজ্জামান মিয়া জানান, ‘মিছিলে সব ধরনের ঢাল-ছুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মিছিলের নিশানা ১২ ফুটের বেশি না হয় সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

উল্লেখ্য, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম কারবালার ফোরাত নদীর তীরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শাহাদাৎ বরণ করেন। সেই শোক-স্মৃতিকে স্মরণ করে সারাবিশ্বের মুসলমানরা আশুরাকে ত্যাগ ও শোকের দিন হিসেবে পালন করে।  আরবি ‘তাজিয়া’ শব্দটি শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করতে ব্যবহার করা হয়।