চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর হিজড়াদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে সাভারের ব্যবসায়ী অখিল কর্মকারকে। মঙ্গলবার নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান। তিনি বলেন, ‘আগে কারও শিশুর জন্ম হলে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নাচ-গান করতো হিজড়ারা। এরপর বখসিস নিয়ে চলে যেত তারা। এখন আর সেই সৌজন্য বোধ নেই। শিশুর জন্মের খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ঘেরাও করে তারা। মায়ের কোল থেকে নবজাতককে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে টাকা দাবি করা তাদের রুটিনওয়ার্ক হয়ে গেছে।’
অখিল কর্মকার বলেন, ‘২২ সেপ্টেম্বর আমি প্রথমবারের মতো পুত্রসন্তানের বাবা হই। সেই আনন্দের দু’দিন পার না হতেই একদল হিজড়া আমার বাড়িতে ঢুকে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে টাকা দাবি করতে থাকে। বাধ্য হয়ে তাদের হাতে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বাচ্চা ফিরে পেয়েছি।’
এদিকে, সাভার ও উত্তরা রুটের বাসযাত্রীরা প্রতিদিনই হিজড়াদের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাভার টু ঢাকাগামী ওয়েলকাম পরিবহনের চালক আবদুস সালাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘কল্যাণপুর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন পর্যন্ত যেকোনও জায়গায় গাড়ি থামালেই হিজড়ারা জোর করে বাসে উঠে পড়ে। বাধা দিলে হেলপারকে মারধরও করে। তাই আমরা তাদের আর বাধা দেই না।’
জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে হিজড়াদের ৩৯টি গ্রুপ রয়েছে। তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে প্রতিদিন কাপ্তান বাজার, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন হাটে-বাজারে ‘তোলা’ তোলে। কেউ দিতে না চাইলে জোর করে মালামাল ছিনিয়ে নেয়।
তৃতীয় লিঙ্গের একজন যৌনকর্মী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বেঁচে থাকার জন্য অনেক কাজই আমাদের করতে হয়। রাত ৮টার পর থেকে বিজয়নগর মোড় থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান পর্যন্ত রাতের বেলায় মেয়ে সেজে বসে থাকি। আমার মতো আরও অনেকেই আছে। তারাও একেকদিন একেক জায়গায় খদ্দরের জন্য অপেক্ষা করে। পুরুষ খদ্দের যখন বুঝতে পেরে আমরা হিজড়া। তখন তারা টাকা না দিয়ে চলে যেতে চায়। এ সময় আমরা জোর করে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করি। চাঁদাবাজির সঙ্গে আমরা জড়িত না।
এ বিষয়ে উত্তরা এলাকার হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রধান আপন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘এখন হিজড়ারা কাজ করে খেতে চায়। এ জন্য পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি হাবিবুর রহমান আমাদের দেখভাল করছেন।’ তবে সামাজিক অসহযোগিতার কারণেই অনেক হিজড়া বাধ্য হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
জানতে চাইলে অ্যাডিশনাল ডিআইজি হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হিজড়ারও তো মানুষ। সবাই যদি ওদের ঘৃণার চোখে দেখে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে তারা বাঁচবে কিভাবে? তাদের কাছে বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া দেন না। তাদের দেখলেই আমরা ভয় পেয়ে যাই। তাড়িয়ে দেই। হিজড়াদের প্রতি আমাদের এমন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তারা চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
হাবিবুর রহমান আরও বলেন, ‘তৃতীয় লিঙ্গের এই জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি গার্মেন্টস কারখানা ও বেশ কয়েকটি বিউটি পারলার গড়ে তুলেছি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ জন হিজড়ার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এভাবে তাদের সবাইকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে পারলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।’
সমাজসেবা অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকাতেই ১০ হাজার হিজড়া রয়েছে। এছাড়া সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরও প্রায় ৫০ হাজারের মতো হিজড়া।
আরও পড়ুন:
নির্বাচনে অংশ নিতে আরপিও সংশোধনে আমলাদের দৌড়ঝাঁপ শুরু
নাফ নদীর তীরে কাঁদছে মানুষ!