থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে আন্দোলন চাঙা রাখছে শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন

দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলনে লাক্সমার শ্রমিকরাবকেয়া বেতন আদায় ও কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে আন্দোলনে থাকা শ্রমিকদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করে আন্দোলন চাঙা রাখছে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন। আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত করতে সংগঠনের পক্ষ থেকে ফান্ড তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান সংগঠনটির নেতারা।

রবিবার দুপুর থেকে আন্দোলন করছেন গাজীপুরের লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেডের শ্রমিকরা। লাগাতার কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রথমদিন রাজধানীর কাওরান বাজারে কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের সামনে দিনভর অবস্থান করেন তারা। পরে বিকাল থেকে বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। রাতে অন্যত্র অবস্থান করলেও সোমবার (২৭ নভেম্বর) সকাল থেকে তারা আবারও বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান নেন।

এদিকে, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাফিনা রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ফ্যাক্টরিতে আগে কখনও শ্রমিকদের বেতন বাকি পড়েনি। আমরা সবসময় শ্রমিকদের বেতন ১ তারিখের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এবার সমস্যায় পড়ার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা ক্রমান্বয়ে সবার বেতনই দিয়ে দিচ্ছি। ইতোমধ্যে শ্রমিকদের একটা বড় অংশের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। বাকিদের পাওনাও পরিশোধ করা হবে।’ একসঙ্গে সবার বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় শ্রমিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।

বকেয়া আদায়ের দাবি নিয়ে রবিবার গাজীপুরের বোর্ড বাজার বড়বাড়ি এলাকা থেকে বাস ভাড়া করে কাওরান বাজার আসেন লাক্সমার শ্রমিকরা। তাদের আসা, খাওয়া ও রাতে থাকার ব্যবস্থা করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন। আন্দোলন চাঙ্গা রাখতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউনিয়নের নেতারা। কারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতর এবং বিজিএমইএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনাও চালাচ্ছেন সংগঠনটির নেতারা। তাদের সঙ্গে শ্রমিক প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন।  

লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেডের শ্রমিকরা জানান, রবিবার সকালে গাজীপুর থেকে বাস ভাড়া করে প্রথমে বিজিএমইএ ভবনের সামনে আসেন তারা। বাস ভাড়া বাবদ কিছু শ্রমিকের কাছ থেকে অল্প করে চাঁদা নেওয়া হয়। এরপর আর কোনও চাঁদা দিতে হয়নি।

রবিবার দুপুর ও রাতের খাবারের জন্য বিজিএমইএ ভবন সংলগ্ন একটি রেস্তোরাঁয় ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া, আন্দোলনরত শ্রমিকদের রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হয় গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের পল্টন অফিসে। রাতের খাবার ছিল খিচুড়ি। সোমবার সকালে তারা ভাত খেয়েছেন। এর ব্যবস্থাও করেছে ট্রেড ইউনিয়ন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শ্রমিক জানান, বাস ভাড়া করে তারা কাওরান বাজার এসেছেন। এরপর থেকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ট্রেড ইউনিয়নের নেতারাই করছেন। শুধুমাত্র চা বা অন্যকিছু তারা নিজেদের টাকায় খাচ্ছেন। এই শ্রমিক জানান, তিনি দশ বছর ওই ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছেন।

শ্রমিকদের আন্দোলন বেগবান করতে ট্রেড ইউনিয়ন সহায়তা করছে বলে স্বীকার করেছেন এর নেতারা। তারা জানান, এই শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাদের অনেককে বাড়ি ভাড়া দিতে না পারায় বাড়ির মালিক বের করে দিয়েছে। তাদের খাওয়া-পরার টাকা নেই। ধারদেনা করে দিন চলছে। তাদের বেতন আদায়ে সহায়তা ও আন্দোলনে সমর্থন করা সংগঠনের দায়িত্ব।

গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মঞ্জুর মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের কাছ থেকে কিছু টাকা চাঁদা নিয়েছিলাম। সেই টাকায় আজ (সোমবার) সকাল পর্যন্ত চলেছে। আন্দোলন চালিয়ে যেতে আমরা ফান্ড জোগাড় করছি। ঢাকার আশপাশের এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাছ থেকে রান্নার উপকরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিজিএমইএ ভবনের সামনে আমরা শ্রমিকদের খাবারের জন্য প্রয়োজনে রান্নার ব্যবস্থা করবো। অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’

রবিবার রাতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কার্যালয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান সংগঠনটি সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার। তিনি বলেন, ‘রাতে বিজিএমইএ ভবনের সামনে নারী শ্রমিকদের অবস্থান করাটা নিরাপদ মনে না করায় সবাইকে নিয়ে আমাদের পল্টন অফিসে যাই। সেখানেই তারা রাতে অবস্থান করেন। সকালে আবার বিজিএমইএ অফিসের সামনে এসে অবস্থান নেওয়া হয়।’

গত ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত লাক্সমা সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছেন শ্রমিকরা। ৩০ অক্টোবর হঠাৎ করেই কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই আন্দোলন করছেন প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকরা। এর ফলে ইতোমধ্যে কারখানার এক হাজার ১০০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনের বেতন পরিশোধ করেছে মালিকপক্ষ। গত ২৩ নভেম্বর বাকিদের বেতন পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু সেদিন মালিকপক্ষ বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। পরে তারা এ মাসের ৩০ তারিখ আরও একটি দিন ধার্য করেন। কিন্তু মালিকের দেওয়া তারিখের ওপর আস্থা রাখতে না পেরে গত দু’দিন ধরে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শ্রমিকরা। তাতে নেতৃত্বসহ সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন।

আরও পড়ুন:

দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করছেন লাক্সমা সোয়েটারের শ্রমিকরা 

আশ্বাসে বিশ্বাস রাখছেন না লাক্সমা সোয়েটারের আন্দোলনরত শ্রমিকরা