সড়ক-স্থাপনা বিশিষ্টজনদের নামে নামকরণে আর কত অপেক্ষা?

২০১১ সালে রাজধানীকে দুটি সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করার পর থেকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার নামকরণ বন্ধ রয়েছে। এই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্টজনদের নামে নামকরণের অসংখ্য আবেদন জমা পড়েছে দুই সিটি করপোরেশনে। কর্তৃপক্ষও বলছে, অনেক আবেদন তাদের কাছে জমা পড়েছে। তারপরও বিষয়টি থমকে থাকায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন আবেদনকারীসহ জনপ্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, নামকরণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে দেশের গুণীজনদের তুলে ধরার এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর কত অপেক্ষা করতে হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনরাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সড়ক, মাঠ, পার্ক, ফ্লাইওভার ও কমিউনিটি সেন্টারসহ অসংখ্য স্থাপনা এখনও বেনামেই রয়েছে। এ অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধিসহ বিশিষ্ট নাগরিকদের নামে এসব সড়ক ও স্থাপনার নামকরণের দাবি দীর্ঘদিনের।

সাধারণত, দেশের বিশিষ্টজনদের অবদানকে স্মরণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার নামকরণ তাদের নামে করা হয়। বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে সিটি করপোরেশনের একটি উপ-কমিটিও রয়েছে। কারও নামে নামকরণের জন্য কোনও আবেদন বা প্রস্তাব পেলে ওই উপ-কমিটি তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। পরে করপোরেশন তা বাস্তবায়ন করে।

২০০৩ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কের নামকরণ শুরু করেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। পরে ঢাকা দুই সিটিতে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর নামকরণের উদ্যোগ থমকে পড়ে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, ঢাকা মহানগরী দুই সিটি করপোরেশনে বিভক্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসকের মাধ্যমেই নগরভবন পরিচালিত হতো। প্রশাসকদের শুধু রুটিন কাজ করা ছাড়া বড় ধরনের কোনও উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষমতা ছিল না। পরে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর নগরবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন আসতে থাকে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, দোয়েল চত্বর থেকে ঢাকা মেডিক্যাল, শহীদ মিনার থেকে পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত, জুরাইন নতুন সড়ক, সাত মসজিদ রোড, বেড়িবাঁধ রোড, কলেজ রোড, প্রেসক্লাবের বিপরীত থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত হয়ে বিডিআর গেট, বলাকার দক্ষিণ থেকে কাঁটাবন, কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কমলাপুর কাস্টম হাউস আইসিডি, যাত্রাবাড়ী ক্রসিং থেকে জুরাইন ডিগ্রি কলেজ (ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়ক), ধোলাইখাল বক্স কালভার্ট রোড, ধোলাইখাল, নবাবপুর রোডের দক্ষিণ মাথা থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক (জনসন রোড), নর্থ ব্রুক হল রোড, চুরির হাট্টা, ডাল পট্রি, টালি অফিস রোড, ওয়াটার ওয়ার্কার্স রোড, আগাসাদেক রোড, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, চাঁনখারপুল মার্কেট, সিক্কাটুলী পার্ক, মানিকনগর এলাকার খালপাড় সংলগ্ন ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়ক, নির্মাণাধীন যাত্রাবাড়ী পার্ক নতুন নামকরণ হয়নি।

এছাড়া, শুধু নম্বর দিয়েই নাম রাখা হয়েছে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা, রামপুরা ও আফতাবনগরসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার সড়কের। সর্বশেষ, ২০১১ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় রাজধানীর আরও বেশ কিছু রাস্তার নামকরণ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন হয়নি।

জানা গেছে, ২০০৬ সালে রায়েরবাজার হাইস্কুল মোড়ের হোল্ডিং নম্বর-২৩১ সুলতানগঞ্জ থেকে ২৯৫/বি টালি অফিস রোড পর্যন্ত সড়কটি ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ ঠাকুর সড়ক’ নামে নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন। এরপর থেকে করপোরেশনের বিভিন্ন বিভাগে চিঠি চালাচালি চলছে। কিন্তু আজও সড়কটির নতুন নামকরণ করা হয়নি। এই মুক্তিযোদ্ধা ঠাকুরগাঁও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত থাকায় বিএনপির নেতা তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা তা বস্তবায়ন করতে দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

লালবাগের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ফজর আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের সড়ক ও স্থাপনাগুলো মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, দেশবরেণ্য ব্যক্তি ও বিশিষ্টজনদের নামে নামকরণের দাবি অনেক আগের। আমাদের কমান্ড কাউন্সিল থেকেও বিভিন্ন সময়ে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের পর বেশ কিছু সড়কের নাম পরিবর্তনও করা হয়েছে। আমরা চাই, প্রতিটি সড়ক ও সরকারি স্থাপনা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করা হোক।’

শুধু নগরবাসীর নয়, খোদ সিটি করপোররেশনের কাউন্সিলরদের পক্ষ থেকেও করপোরেশনের বোর্ড সভায় এ বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. সুলতান মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে দাবি জানিয়ে আসছি। আমি গুলবাগ ষষ্ঠ গলির নতুন নামকরণ করতে এলাকার তিনজন মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রস্তাব করেছি। কিন্তু সে বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি মেয়র সাঈদ খোকন মুক্তিযোদ্ধাদের লিখিতভাবে আবেদন করার কথা জানিয়েছেন।’

৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আব্দুল বাসেত খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ দায়িত্বে থাকাকালে তিনি মানিকনগর এলাকায় ৬০ ফুট প্রশস্ত একটি সড়ক নির্মাণ করেন। যেটি খালপাড়া রোড নামে পরিচিতি। এলাকার মানুষের দাবি অনুযায়ী সড়কটি তার নামে নামকরণের প্রস্তাব করেছি। কিন্তু এখনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আবুল কালাম (অনু) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ীতে নির্মাণাধীন পার্কটি প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের নামে নামকরণের প্রস্তাব করেছি।’

এছাড়া, শাহবাগ-সায়েন্স ল্যাব সড়কটির নাম জঙ্গি হামলায় নিহত বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়ের স্মরণে নামকরণের দাবি উঠেছিল। এজন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে একটি আবেদনও করা হয়েছিল। সে সময় মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন আশ্বাস দিলেও তা আজ  পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

এ ব্যাপারে সড়ক নামকরণ উপ-কমিটির প্রধান ও ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নামকরণের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অবদান স্মরণীয় করে রাখতেই এটি করা হয়। এ বিষয়ে অনেকেই আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো আমাদের কাছে রয়েছে। আমাদের উদ্যোগও আছে। মেয়রও বিভিন্নজনকে বলেছেন তাদের প্রস্তাব আবেদন আকারে জমা দেওয়ার জন্য। নগরবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন এলে বিষয়গুলো আমরা বোর্ডসভায় উত্থাপন করব।’

জানতে চাইলে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেকগুলো আবেদন জমা হয়েছে। আমরা এগুলো এ সংক্রান্ত কমিটির কাছে জমা দিয়েছে। এখনও কমিটির বৈঠক হয়নি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

ডিএনসিসির সড়কগুলোর বিষয়ে সংস্থার প্যানেল মেয়র ওসমান গণি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরবাসী ও কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মহল থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় দাবি উঠেছে। আমরা বোর্ড সভায় কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।’