পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের আঘাতে দু’চোখ হারানো কলেজ শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান এখন কাজ করছেন এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডে। চাকরিতে নিজের দক্ষতা বাড়াতে এখন ব্রেইল শিখতে চান তিনি। গত রবিবার তেজগাঁওয়ের মধ্য বেগুনবাড়ির ভাড়া বাসায় আলাপকালে সিদ্দিকুর বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানান।
সিদ্দিকুর বলেন, ‘অফিসের সহকর্মীরা খুবই আন্তরিক। তাদের সহযোগিতা নিয়ে সবার ফোন রিসিভ করি এবং অন্যদের সঙ্গে ফোনের সংযোগ দিই। এখন ব্রেইল শিখতে চাই। তাহলে অফিসের ৯০ শতাংশ কাজ আরও ভালোভাবে করতে পারবো। বন্ধুদের দিয়ে খোঁজ নিয়েছি। মিরপুর, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ব্রেইল শেখার সুযোগ আছে, বলে জানিয়েছে তারা।’
বর্তমানে মধ্য বেগুনবাড়ির নিচতলার এক রুমের ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। আলাপকালে সিদ্দিকুর বলেন, ‘আলো-বাতাসহীন এই ঘরে থাকতে কষ্ট হয়, কিন্তু উপায় নেই। এই রুমের ভাড়া ছয় হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল নিজের। দূরে বাসা ভাড়া নিলে যাতায়াতে কষ্ট হবে, তাই এখানেই বাসাটা নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। আমি শিক্ষার্থীদের জন্য নিজের চোখ দিয়েছি। এমন ত্যাগ যদি কাউকে দিয়ে হয় তো এটা তার অনেক ভাগ্যের। আমার এখন কিভাবে দিন কাটে, তা স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। মনের মধ্যে শক্তি কোথা থেকে পাই- এটা কেউ বুঝবে না।’
সিদ্দিকুর জানান, অফিস যেতে কখনও মা আবার কখনও ভাগ্নে সহায়তা করে। দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনেই খাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘অফিস সবাইকে লাঞ্চ করায়। অফিসের সবার বেতনের সঙ্গে খাবারের টাকা সমন্বয় করে নেয়। এমডি স্যার থেকে শুরু করে সবাই একই খাবার খান।’
নিজের বন্ধুদের বিষয়ে সিদ্দিকুর বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সময় পেলেই শাহ আলীসহ আরও দু’জন বন্ধু আসে। উত্তরা থেকে আমার বন্ধু এসে বেগুনবাড়ি মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে নিয়ে গেছে। জীবনে বন্ধুদের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। আমার বন্ধুরা টানা ৬০-৭০ দিন হাসপাতালে ছিল। সেই সময় আমার পাশে থাকার কারণে আমার দু’জন বন্ধুর টিউশনি চলে যায়। তবুও এক সেকেন্ডের জন্য ছেড়ে যায়নি।’
সিদ্দিকুরের সঙ্গে ভারতে গিয়েছিলেন তার ‘মেনন স্যার’। তিনি বলেন, ‘আমার তৃতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা ছিল মিরপুর বাংলা কলেজে। পাশেই স্যারের বাসা। রোজ দুপুরে তার সঙ্গে লাঞ্চ করতে হয়েছে। মেনন স্যার ও তার পরিবারের কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞ।’
সিদ্দিকুরের মা বলেন, ‘ওর মনের জোর খুব আছে। এটা আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। মা, ভাইবোন সবাইকে দেখে রাখতো। এখন তারা তাকে দেখে রাখছে।’
তবে কয়েকজন মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন সিদ্দিকুর। তাদের একজন তাকে বলেছিল, ‘আপনার এখন তো চোখ নেই। মিডিয়ায় আপনার পরিচিতি বেড়েছে। আপনি তো ভিক্ষা করেও খেতে পারবেন না। আর একজন বলেছিল, ‘অন্যের জন্য কেন আপনি গেলেন? এখন আপনার কী লাভ হলো?’
সিদ্দিকুর বলেন, ‘ওসব নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোনও কষ্ট নেই। আমি অনিয়ম প্রিয় ছিলাম। কেউ বললে কাজ করতে ভালো লাগতো না। কখনও এক মিনিটের জন্যও বাড়িতে বসে থাকিনি। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি! কিন্তু কখনও কাঁদি না, তবে ভীষণ একা লাগে।’
ছবি- নাসিরুল ইসলাম