ছাত্রলীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যোগ দিতে ঢাকায় আসার সময় শনিবার বাসের মধ্যে গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া ছাত্রলীগকর্মীদের শরীরের চার থেকে ছয় শতাংশ পুড়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।
রবিবার (৭ জানুয়ারি) ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমি আজ সকালে গিয়ে ওদের দেখে এসেছি। ওরা ভাল আছে। ওদের শরীরের চার থেকে ছয় শতাংশ পুড়েছে। তবে ওরা এখন শঙ্কামুক্ত। ওদের ধীরে ধীরে ছেড়ে দেওয়া হবে।’
ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অগ্নিদগ্ধরা এখন শঙ্কামুক্ত। তবে তাদের অবস্থা ভাল নয়। কারও দুই হাত পুড়ে গেছে। কারও পুড়ে গেছে পেট, পিঠ, মুখ ও মাথার চুল। আহতদের মধ্যে দুই-তিন জন হাঁটাচলা করতে পারলেও বাকিরা শয্যাশায়ী।
জানা যায়, অগ্নিদগ্ধরা সবাই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের উত্তরা পশ্চিম থানা ইউনিটের কর্মী। একদিন অবজারভেশন রুমে রাখার পর হাসপাতালে ভর্তির করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পাঁচ জনকে। গুরুতর আহতরা হলেন-রিফাত (১৬), রানা (১৩), রওশন (১৮),আকাশ (১৮) ও মেহেদী হাসান হীরা (২১)। ডাক্তারের ছাড়পত্র নিয়ে সকালে বাসায় ফিরেছেন সৌরভ (১৮), কাব্য (২১) ও সাম্য (১৮) নামের তিন জন। এর আগে ঘটনার রাতে (শনিবার রাতে) হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন জুয়েল (১৮), কামরুজ্জামান (১৫), সাব্বির (১৫) ও মধু (১৭) নামের চার জন।
অগ্নিদগ্ধদের মধ্যে সবার ছোট রানা ইসলাম। সে এবার অষ্টম শ্রেণি পাস করেছে। তার বেডের পাশে মলিনমুখে বসে থাকতে দেখা যায় বড় ভাই শফিকুল ইসলামকে। তিনি বলেন, ‘আমরা উত্তরা ১৪-তে থাকি। বাবা মারা গেছেন। পরিবারে মা, তিন ভাই ও দুই বোন আছেন। আমরা কোনও দল করি না। কাজ করে খাই। রানা কাউকে কিছু না বলেই চলে গেছে। পরে এই ঘটনা শুনেছি।’
হাসপাতালেই পাওয়া যায় তালাল আল নাহিয়ান নুর রওশনের দুলাভাই জামালকে। তিনি বলেন, ‘মা-বাবা বেঁচে নেই। ফুফাতো বোনের বাড়িতে থাকে সে। এমনিতেই ওর আপন কেউ নেই। তার ওপর এই বিপদ। ছেলেটাকে নিয়ে আমরা খুবই কষ্টে আছি। ওকে এখন কে দেখবে!’
অগ্নিদগ্ধ রিফাতের বাবা আলম শিকদার বলেন, ‘ছেলের এই অবস্থা চোখে দেখে সহ্য হয় না। সকালে সিস্টাররা ওষুধ লিখে দিয়েছে। অনেকগুলো অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম এনে দিলাম। এগুলো ওদের সবার মুখে লাগানো হয়েছে। ক্রিমগুলো এদের (হাসপাতালের) স্টকে নেই, তাই আমাদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।’
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র আকাশকে দেখতে এসেছিলেন তার একজন ক্লাসমেট। ক্লাসমেটকে আকাশ বলেন, ‘একটা বিছানায় কতক্ষণ শুয়ে থাকা যায়! আমার মতো মানুষকে যারা এভাবে আগুনে পুড়িয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখছে তাদের ভাল হবে না।’
রাত থেকে আহত ছাত্রদের পাশে অবস্থানকারী জিদান আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘আমরা শ্লোগান দিতে দিতে ফার্মগেট পর্যন্ত এসেছি। তখন আমরা সবাই খুব ভালই ছিলাম। টিভিতে যেমন দেখা যায়- কোনও কিছু ব্লাস্ট হলে আগুন ছড়িয়ে যায়, আমরাও সেরকমই দেখলাম। আমি সামনে ছিলাম তাই আমার কিছু হয়নি। আমাদের যে সঙ্গীরা বাসের মাঝামাঝি জায়গায় বসে ছিল তারা পুড়ে গেছে।’
জিদান আরও বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমাদের প্রোগ্রামের ক্ষতি করার জন্য কেউ এটা করেছে।’
বিস্ফোরণের ঘটনা সম্পর্কে জিদান বলেন, ‘আমাদের বাসে অনেকগুলো বেলুন ছিল। বাসে আমরা অনেকেই ছিলাম। এরমধ্যে ১৩ জন দগ্ধ হয়। আমাদের মধ্যে হীরা যখন বাসের আগুন নেভাতে যায়, তখন সে বাসের নিচে কৌটার মত বস্তু দেখতে পায়। ওর কথা মতো আমাদের মনে হয়েছে নাশকতা করার জন্য বিএনপি-জামায়াত এটা করে থাকতে পারে ।’
উল্লেখ্য, শনিবার (৬ জানুয়ারি) শাহবাগে আয়োজিত ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাইদা পরিবহনের দুটি বাসে চড়ে উত্তরা ১১ নম্বর থেকে রওনা দিয়েছিলেন কর্মীরা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফার্মগেট আল-রাজী হাসপাতালের একটু আগে ফুট ওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় পেছনে থাকা বাসটির ভেতর একটি শব্দ হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আগুন ধরে যায় বাসের ভেতর। এসময় আগুনে পুড়ে আহত হন ১২ জন কর্মী।