ফুটপাতের কুয়াশা মোড়া মানুষগুলো

শীতের রাতে মা-বাবার সঙ্গে ফুটপাতে ঠাঁই হয়েছে এ শিশুরঘড়ির কাটায় সোমবার রাত ঠিক ১২টা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ফুটপাত। কনকনে শীতের রাতে ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলো। ঘন কুয়াশায় মোড়া ফুটপাতে আবছা দেখা যায় এলোমেলো বস্তা মতো কিছু পড়ে আছে। হুট করে মনে হবে এগুলো পরিত্যক্ত। কাছে গিয়ে দেখা গেলো কিছু ছিন্নমূল মানুষ এগুলোর ভেতর ঢুকে শুয়ে আছেন। চেষ্টা করছেন ঘুমানোর। আর কয়েকজন কাঠে আগুন ধরিয়ে তাপ পোহাচ্ছেন। প্রবল শীতে এ সামান্য আচ্ছাদনে ঘুম আসছে না তাদের।

কারও গায়ে আছে পাতলা কম্বল, কারও তাও নেইহাড়কাঁপানো শীতে জবুথবু হয়ে আছেন মানুষগুলো। কুয়াশামোড়া ফুটপাতই তাদের ঠাঁই। সারাদিন শহরে নানা কাজ শেষে এই ফুটপাতেই রাতে আশ্রয় নেন তারা। শীতের রাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নামমাত্র যে শীতবস্ত্র গায়ে আছে তা এ ঠাণ্ডা ঠেকাতে পারছে না। একটু উষ্ণতার খোঁজে আশ্রয় নিয়েছেন বস্তায়। আরও আছে আশপাশ থেকে ছিঁড়ে আনা ব্যানার-ফেস্টুনের কাপড়–এগুলোই শীতের রাতে তাদের ভরসা। কিন্তু তাতেও ঘুম আসছে না। হিমেল হাওয়ায় আরও ঠাণ্ডা হয়ে উঠছে এ আচ্ছাদন। এর মধ্যেই চলছে কোনোমতে রাত পার করার অপেক্ষা। কথা বলতে চাইলেও তাদের কেউ রাজি হলেন না। তীব্র শীতে এমন বসবাস নিয়ে কী-ই বা বলার থাকে!

ফুটপাতে ঘুমাচ্ছেন এক ছিন্নমূল মানুষএকই অবস্থা দেখা গেছে ফার্মগেটে তেজগাঁও সরকারি বালিক উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন ফুটপাতে। সেখানে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে আছেন ২০ জনের মতো নারী-পুরুষ। তাদের অধিকাংশের গায়েই পাট ও প্লাস্টিকের বস্তা। তাদের একজন ষাটোর্ধ্ব আনোয়ারা। শীতের কথা জানতে চাইলে নিয়ে যান জীবন নামক এক দুঃখের সংসারে।

ফার্মগেটের ফুটপাততিনি জানান, ৩১ বছর আগে স্বামী এক প্রতিবন্ধী মেয়েকে সংসারে রেখে মারা যান। একমাত্র ছেলেটি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বর্তমানে তার কেউ নেই। ভিক্ষা করে যে  ক’টাকা পান, তা দিয়েই কোনোভাবে চলেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে ঢাকায় আছেন। থাকেন তেজগাঁও রেলস্টেশনে। গত কয়েকদিনের কনকনে শীতের কারণে একটি কম্বলের আশায় সেখানকার আরও কয়েকজন ভিক্ষুকসহ এসেছেন ফার্মগেটের এই ফুটপাতে।

আগুন জ্বালিয়ে চলছে শীত নিবারণের চেষ্টাএকটি কম্বল পেয়ে ছিলেনও। কয়েকজন লোক এসে সবাইকে একটি করে কম্বল দিয়ে গেছেন। কিন্তু যে কম্বল দেওয়া হয়েছে তা পাটের বস্তার চেয়ে বেশি উপকার দেয় না। কম্বলগুলো এতই পাতলা যে গায়ে দেওয়ার পর এর ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসা-যাওয়া করে। তাই তারা কম্বলের পাশাপাশি পাটের বস্তা ও পুরনো কাপড় দিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। আনোয়ারা বলেন, ‘যে ঠাণ্ডা পড়ছে, এবার মরণ দশা হবে। রাতের বেলায় অনেকই গরিব-দুঃখীরে শীতের কাপড় দেয়। সে আশায় রেলস্টেশন থেকে এখানে এসেছি। সাতদিন ধরে রাতে এখানে থাকি। এই সময়ে দুটি কম্বল পেয়েছি। কিন্তু এগুলো এত পাতলা, শীত মানে না।’

ফুটপাতে রাত্রিযাপনময়মনসিংহ থেকে আসা সোহরাব বানু নামের আরেক পথবাসী বলেন, ‘করার কিছুই নেই। কেউ কি আমাদের দিকে ওভাবে দেখে? চাইলে দুই-চার টাকা দেয়। এ দিয়ে পরিবার চলে না। শীতের পোশাক কিনবো কিভাবে? দেখ না বাবা, এই শীতের মধ্যে কিভাবে পড়ে আছি।’

হাইকোর্টের মাজারের সামনের ফুটপাতে ঘুমন্ত মানুষহাইকোর্টের মাজার গেটে গিয়ে দেখা গেছে, ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছেন শতাধিক মানুষ। অনেকের সঙ্গে শিশুও রয়েছে। তাদের কারও কারও গায়ে কম্বল। বাকিদের গায়ে পুরনো কাপড়, বস্তা। কথা হয় আসমা আক্তার নামের একজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গতবছর দুইটা কম্বল পেয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলো শীত মানে না। বাচ্চাটারে নিয়ে অনেক বিপদে আছি। যে হারে শীত বাড়ছে, এভাবে কয়দিন চললে বাঁচা যাবে না।’

ফুটপাতেই ঠাঁই নিয়েছেন এই নারীসোমবার রাতে নগরীর ফার্মগেট, কাওরান বাজার, শাহবাগ, টিএসসি, হাইকোর্ট গেট, মাজার গেটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ছিন্নমূল মানুষের এমন দুর্দশার চিত্র।

সারাদেশই কয়েকদিন ধরে শৈত্যপ্রবাহে নাকাল। রাজধানীতেও কুয়াশার পাশাপাশি প্রবল হিমেল হাওয়া বইছে। হাড়কাঁপানো শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন নগরীর ছিন্নমূল মানুষজন। প্রচণ্ড শীতে কাজেও যেতে পারছেন না অনেকে।

ছবি- নাসিরুল ইসলাম