‘আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলতে পারেন না’

হাইকোর্টসংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা নিয়ে দায়ের রিট খারিজ করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি আশরাফুল কামাল বলেছেন, ‘বিচার বিভাগকে তার নিজস্ব সীমা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। আইনপ্রণেতারা কী উদ্দেশ্যে আইন করছেন, তা নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলতে পারেন না।’ 

সোমবার (১৫ জানুয়ারি) ‘রাজনৈতিক দল হতে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়া’ সংক্রান্ত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিভক্ত আদেশ দেন হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ। রিটের শুনানি শেষে বেঞ্চটির জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ৭০ অনুচ্ছেদ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। তবে বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি আশরাফুল কামাল রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

শুনানি শেষে বেঞ্চটির জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক”। কিন্তু, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই তাদের। দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ তাদের নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাধীন নন। তারা নিজ দলের কাছে পরাধীন। দল যা বলবে, তাই করতে হবে। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সব ক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক দল, জনগণ নয়।’ 

এই বিচারপতি বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত মামলা শুনানিকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ওইসব দেশে আইনপ্রণেতারা স্বাধীনভাবে মতামত দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে আমার অভিমত হলো, ওইসব দেশে ৭০ অনুচ্ছেদের মতো কোনও অনুচ্ছেদ নেই। ওইসব দেশের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আমাদের সংসদ সদস্যদের মৌলিক পার্থক্য নেই। তবে আমাদের দেশে দলীয় হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ 

জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আরও বলেন, ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিষয়ক মামলায় এই আদালত (হাইকোর্ট) ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে যে অভিমত দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ গ্রহণ করেছেন। মনে রাখতে হবে, আপিল বিভাগের দেওয়া রায় আমাদের (হাইকোর্ট) জন্য মানা বাধ্যতামূলক। এ রিট আবেদনে রুল জারির মতো প্রাথমিক উপাদান রয়েছে। এ কারণে রুল জারি করা হলো।’

এরপর কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল রিট আবেদনটি খারিজ করে দেওয়া আদেশে বলেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত মামলায় ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে হাইকোর্ট যে অভিমত দিয়েছেন তা আপিল বিভাগ গ্রহণ করেছেন ঠিক। তবে ষোড়শ সংশোধনী মামলা ছিল বিচার বিভাগ সংক্রান্ত। সেখানে বিচারক অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রসঙ্গ ছিল। সেখানে ৭০ অনুচ্ছেদ বিচার্য ছিল না।’ 

এই বিচারপতি আরও বলেন, ‘১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়। সেসময় যেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে, আজ পর্যন্ত সেভাবেই রয়েছে। এ অনুচ্ছেদের যৌক্তিকতা নিয়ে অতীতে কোনও সরকার বা সংসদে প্রশ্ন ওঠেনি। জনগণও প্রশ্ন তোলেনি। ৭০ অনুচ্ছেদের অপব্যবহার হয়েছে, এমন নজিরও আমাদের সামনে নেই।’ 

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত যে, আদালত সংবিধান বা আইন প্রণয়ন করে না। শুধুই বলতে পারে, সংসদে প্রণীত আইন সংবিধান পরিপন্থী কিনা। এ কারণেই সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে রায় দিয়েছেন।’ 

বেঞ্চের কনিষ্ঠ এই বিচারপতি তার আদেশে আরও বলেন, ‘রিট আবেদনকারী তার আবেদনে বলেননি ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানের আর কোন কোন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এও বলেননি যে, আইনপ্রণেতা কর্তৃক প্রণীত আইন বাতিল করার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনগণ সব ক্ষমতার অধিকারী। আর সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি। তাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আইন প্রণয়নে আদালত বাধ্য করতে পারেন না। কার্যত, সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্যই আদালতের সৃষ্টি। আদালতের দায়িত্ব সেটাই। বিচার বিভাগকে তার নিজস্ব সীমা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। আইনপ্রণেতারা কী উদ্দেশ্যে আইন করছেন তা নিয়ে আদালত প্রশ্ন তুলতে পারেন না।’ 

আরও পড়ুন:

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত আদেশ