চিকিৎসকদের হাতে লেখা প্রেসক্রিপশনে অস্পষ্টতা আছেই

হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য এসেছেন আফিয়া (৫৬)। তাকে চারটি ওষুধ খেতে দেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট অক্ষরে সেগুলোর নাম লিখেছেন চিকিৎসক।

এদিকে রুমা (২৫) এসেছেন বিএসএমএমইউ’র জেনারেল সার্জারি বিভাগে। তাকেও বেশ কয়েকটি ওষুধ লিখে দিয়েছেন চিকিৎসক। সঙ্গে উল্লেখ রয়েছে কোনটি খাওয়ার আগে আর কোনটি খাওয়ার পরে খেতে হবে। কিন্তু প্রেসক্রিপশনের লেখা দেখে ঠিকঠাক বোঝার উপায় নেই কোন কোন শব্দ আছে এতে!

একই বিভাগে কয়েকটি টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে এসেছেন রহিমা (৪০)। তার কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে দেখা যায়, এতে ছোট হাতের অক্ষরে রোগের বর্ণনা ও টেস্টের নামগুলো লিখেছেন চিকিৎসক। কিন্তু তা অত স্পষ্ট নয়।

বিএসএমএমইউ’তে বিভিন্ন রোগীদের প্রেসক্রিপশন দেখে চিকিৎসকদের হাতের লেখায় অস্পষ্টতা পাওয়া যায়। একই চিত্র জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনেও। কোনও কোনও প্রেসক্রিপশনের লেখা স্পষ্ট হলেও কোনও কোনোটি বেশ অস্পষ্ট। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রোগীরা।

শ্যালকের সঙ্গে কিডনি রোগের চিকিৎসা করাতে বিএসএমএমইউ’তে এসেছেন অজিত। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বহু চিকিৎসকের লেখাই খারাপ দেখেছি। চিকিৎসকরা এত তাড়াহুড়ো করে লেখেন যে শব্দ ঠিকঠাক বোঝাই যায় না।’

রোগীর অ্যাটেন্ডেন্ট সুরাইয়া আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব চিকিৎসক অস্পষ্ট করে লেখেন তাদের ওপর আমার খুব রাগ হয়। একবার এক চিকিৎসক এমনভাবে ওষুধের নাম লিখেছিলেন, পরে আমাকে ওই চিকিৎসকের কাছে আবারও গিয়ে নাম জেনে আসতে হয়েছে।’

হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন

রোগী হাফসা প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এখানে দেখেন লিখেছে খাবার আগে। কিন্তু ‘খাবার’ কথাটা এমন করে লিখেছে যে পড়াই যাচ্ছে না।”

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রেসক্রিপশন স্পষ্ট ও বড় অক্ষরে অথবা ছাপানো আকারে লিখতে চিকিৎসকদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রারের প্রতি এই নির্দেশ দেওয়া হয়।

একইসঙ্গে রোগীদের জন্য স্পষ্টভাবে ব্যবস্থাপত্র লেখায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না ও ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের জেনেরিক নাম লেখার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুল জারি করেন আদালত।

স্বাস্থ্য সচিব, বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সেক্রেটারিসহ বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেন।

ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ওষুধের দোকানের সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার। এগুলো ছাড়াও প্রায় ১০ হাজার অনিবন্ধিত ওষুধের দোকান রয়েছে।

রাজধানীর লালবাগ, আজিমপুর ও শাহবাগ এলাকার ওষুধ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়— এখনও অনেক চিকিৎসকই হাতে লিখে প্রেসক্রিপশন দিয়ে থাকেন। বিক্রেতারা বলছেন, ‘চিকিৎসকদের কারও কারও লেখা বেশ স্পষ্ট হলেও কারও কারও লেখা একেবারেই বোঝা যায় না। কখনও কখনও রোগীকে আবার ওই চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হয়। তবে কেউ কেউ কম্পিউটারে লিখে প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন। এতে আমাদের জন্য খুব সুবিধা হয়।’

বিক্রেতাদের মধ্যে নাফিসা ফার্মেসির সদরুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক সময় রোগীরা এতদূর থেকে প্রেসক্রিপশন নিয়ে আসেন যে তখন তাকে আর ফেরত পাঠানো যায় না। তখন তাকে মোটামুটি যেটা বোঝা যায় সেই ওষুধ দিয়ে দিই।’

হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন

বিএসএমএমইউ’র ট্রেজারার অধ্যাপক ডা. আলী আসগর মোড়ল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনও কিছু প্রেসক্রিপশন অস্পষ্ট থাকে, এটা সত্যি। তাই আমরা প্রতিটি ডিপার্টমেন্টসহ পুরো ব্যবস্থাকে অটোমেশনের আওতায় আনতে চাই। এটা বাস্তবায়ন হলে প্রতিটি রুমে একটি করে কম্পিউটার থাকবে। তখন সব প্রেসক্রিপশন হবে প্রিন্টেট। এজন্য আমাদের ল্যান্ড লোকাল নেটওয়ার্ক লাগবে। আমরা এখন এ নিয়ে কাজ করছি। পুরোটা অটোমেশনের আওতায় চলে এলে আর কোনও প্রেসক্রিপশন হাতে লেখা হবে না।’

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থবরাদ্দ পাওয়া নিয়ে বিএসএমএমইউ’র একটি চুক্তি হয়েছে বলে জানান ট্রেজারার ডা. আলী আসগর। তার ভাষ্য, ‘প্রেসক্রিপশন অবশ্যই স্পষ্ট করে লিখতে হবে। কারণ, এটা রোগীর জীবন-মরণের প্রশ্ন। আশা করি এ বিষয়ে আদালতের রায় হওয়ার পর থেকে চিকিৎসকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। আমরা চাই সহজে পড়া যায় এমন প্রেসক্রিপশন লিখবেন চিকিৎসকরা।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রশীদ-ই মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘প্রেসক্রিপশন অবশ্যই স্পষ্ট হওয়া জরুরি। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেই বলা আছে—চিকিৎসকদের হাতের লেখা স্পষ্ট হতে হবে। কারণ, অস্পষ্ট হাতের লেখার কারণে ভুল ওষুধ পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কারও হাতের লেখা হুট করেই তো আর ভালো করা যায় না। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বড় অক্ষরে লিখলে বা কম্পিউটারাইজড করলে সমাধান আসতে পারে।’

এ বিষয়ে ওষুধের দোকানে সচেতনতা বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। কারণ, তারাই চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন পড়ে ওষুধ দেন রোগীকে। তিনি বলেন, ‘ওষুধের দোকানে কর্মরত লোকজন যদি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ঠিকমতো পড়তে না পারেন তা রোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’