‘শিক্ষামূলক সেবাগুলোকে সবারই পরিচর্চা করতে হবে’

মাদিহা মোর্শেদ (ছবি- ঢাকা ট্রিবিউন)

বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন স্কলাসটিকা স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাদিহা মোর্শেদ। ওই আলোচনার চুম্বক অংশ বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

সরকার বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর জন্য ভ্যাট অব্যাহতি দিলেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো থেকে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আদায় করছে। এটাকে বৈষম্যমূলক আচরণ বলছেন অভিভাবকরা। আপনি কি মনে করেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর অবদান বাড়াতে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার সহায়ক হবে?

সম্প্রতি হাইকোর্ট এক নির্দেশনায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো থেকে ভ্যাট আদায় বন্ধ করে দেন। ফলে অভিভাবকরাও এখন আর ভ্যাট পরিশোধ করেন না। তারপরও সমস্যাটির সমাধান হয়নি। আমি বিশ্বাস করি, কোনও দেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটা প্রযোজ্য। আমাদের দেশের জনসংখ্যা অনেক, এদের অনেকেই উদ্যোক্তা, প্রাণবন্ত এবং কঠোর পরিশ্রমী। তাই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সবাইকে শিক্ষা এবং ভালো শিক্ষামূলক সেবাগুলোকে অবশ্যই পরিচর্চা, সমর্থন এবং উৎসাহিত করতে হবে।

আমি মনে করি, শিক্ষার ওপর যেকোনও ভ্যাট আরোপ শিক্ষা খাতের জন্য সীমাহীন বোঝা। এখন অনেক মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিভাবক তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ভর্তি করান। সুতরাং এই শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর যেকোনও ধরনের ট্যাক্স তাদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমাদের দেশে বিদ্যমান চমৎকার শিক্ষামূলক সেবাগুলো গ্রহণ করতে অভিভাবকদের উৎসাহী করা উচিত। অনেক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান এবং গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার্থীদের ভালো সুযোগ-সুবিধা দেয়। যা উৎপাদনশীল, উন্নয়নশীল এবং কঠোর পরিশ্রমী যুবক হিসেবে গড়ে উঠতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা আমাদের দেশের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারবে।

কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ ওঠায় সম্প্রতি সরকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষকরা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। এই ধরনের চিন্তা ভাবনা ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থায় কতটুকু প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন? একই সঙ্গে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগকে আপকি কিভাবে দেখছেন?

আমি মনে করি, স্কুল কর্তৃপক্ষের জন্য এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত। দেশের সব স্কুলে নিয়ম নীতি মানা হচ্ছে কিনা—তা নিশ্চিত করতেই সরকার এসব তথ্য সংগ্রহ করতে চাচ্ছে। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তাহলে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করা উচিত এবং স্কুল কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে দায়বদ্ধ থাকা উচিত।

কিন্তু আমি এটাও মনে করি, জঙ্গিবাদের সমস্যা যদি শুধু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর সমস্যা মনে করা হয়, তবে সেটা ঠিক হবে না। গত কয়েক বছরে যেসব জঙ্গি শনাক্ত বা আটক করা হয়েছে, তাদের তথ্য বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, জঙ্গিরা বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে। তাই সমাজের কোনও অংশকে অবহেলা না করে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, আমাদের সবারই উচিত অভিভাবকদের সমর্থন করা। কারণ, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে বদ্ধপরিকর। যারা আমাদের জাতির জন্য গর্বের এবং দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি স্কুল কর্তৃপক্ষকে এ দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা উচিত।

সরকারি পলিসি অনুযায়ী, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থী ভর্তি ও সেশন ফি প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। আপনি কি মনে করেন, মান বজায় রাখতে সব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর পক্ষে এ পলিসি মানা সম্ভব?

সর্বশেষ গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো একবছরে ১০ শতাংশের বেশি ফি বাড়াতে পারবে না। তবে যা-ই হোক, ফি’র হারটাও নির্ধারিত নয়।

অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো অতিরিক্ত ফি আদায় করে। কারণ, তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মনে করেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

আমাদের শিক্ষার্থীদের আমরা উচ্চ মানসম্পন্ন সুযোগ-সুবিধা দেই, সে অনুযায়ীই মূল্যটা নির্ধারণ করি। অবশ্যই আমরা ব্যবসা করি, কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিকমানের সেবাও দিয়ে থাকি। তাই টিউশন ফি ছাড়া শিক্ষার্থীদের এ ধরনের সেবা কিভাবে দেবো? যা-ই হোক, আমি নিশ্চিত যে, আমরা যেকোনও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতোই সেবা দিয়ে থাকি।

বছরের পর বছর ধরে স্কুলগুলোতে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন ও উন্নয়ন হয়েছে। যার মাধ্যমে একটি স্কুল আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে। এসব স্কুলে খেলা, অনুষ্ঠান, অঙ্কন এবং বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া হয়। এখন স্কলাসটিকা বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং উচ্চমানের প্রাইভেট স্কুল।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের কোন সমস্যাটা আপনি সরকারের নজরে আনতে চান?

আমরা ইতোমধ্যে সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে তারা আমাদের পরামর্শ ও সহায়তা দিয়েছেন। তবে এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ হলে ভালো হতো। আমি মনে করি, আমাদের বেশকিছু সমস্যা অনেক কঠিন এবং বিভিন্ন উপায়ে পরিচিত করানো হয়। তবে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সরকারের সঙ্গে থেকে কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে উন্মুক্ত সংলাপ করা উচিত এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ পরিহার করা উচিত। গত কয়েক বছরে বড় পরিসরে এগুলো করতে পেরে আমি খুবই খুশি।