তিন বছরে অভিজিতের স্ত্রী বন্যা আহমেদের শিক্ষা

অভিজিৎ ও বন্যা আহমেদ‘ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সমাজ ও পৃথিবীকে একটু সাহস করে দেখতে শুরু করলে, একে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে ফেলে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করলে, নিজের কষ্টগুলো একটু হলেও কমে আসে—এটাই আমার শিক্ষা গত তিন বছরে।’ কথাগুলো লিখেছেন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী গবেষক অ্যাক্টিভিস্ট বন্যা আহমেদ।

তিন বছর আগে এই দম্পতি ঢাকায় জঙ্গি হামলার শিকার হন। ওই হামলায় চোখের সামনে নিহত হন তার সহযোদ্ধা, জীবনসঙ্গী ও মুক্তমনা ব্লগের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ রায়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফুটপাতে নিহত হন অভিজিৎ।
তিন বছর পর বন্যা আহমেদ তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন ফটোসাংবাদিক জীবন আহমেদের লেখা—যিনি ঘটনার দিন তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যান। জীবন আহমেদ তার লেখায় দায়িত্ববোধের কথা লিখেছেন। আর বন্যা সেটা শেয়ার করে লিখেছেন, ‘‘আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানবেন। সেদিন আমাদের সম্পর্কে কিছুমাত্র না জেনে, শুধুমাত্র মানবতার দাবি মেটানোর জন্য, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য, অভিজিৎকে সেদিন রাতে কয়েক ঘণ্টা বেশি বাঁচতে দেওয়ার জন্য, আমাকে মাথায় এবং ঘাড়ে চারটি ৬-৭ ইঞ্চি চাপাতির আঘাত এবং আঙ্গুল খসে পড়া উন্মুক্ত আঘাতের রক্তপাত থেকে বাঁচিয়ে, এই ছোট্ট পৃথিবীতে ‘বোনাস’ সময়টা দেওয়ার জন্য।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমাদের মেয়ে প্রায়ই বলে যে আপনার নাম যে ‘জীবন’ সেটা আমার এবং অভির জন্য আসলে একটা আইরনিক ঘটনা। আমার এবং অভিজিতের পরিবার আপনার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ, যেটা হয়তো আপনাকে কোনো দিন বলা হয়নি।’

ফেসবুকে বন্যা আহমেদের স্ট্যাটাসবন্যা আহমেদ ২৪ ফেব্রুয়ারি নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘এই মাসটা খুব ওলোট-পালটের মাস। ২৬ তারিখ ক্রমশ এগিয়ে আসতে থাকলে ‘ভাল খারাপের’ প্রশ্নটাও করতে ভয় লাগে। ফেসবুকে আমার অনুপস্থিতি দেখে অনেকেই কুশল জানতে চেয়েছেন, সহানুভূতি জানিয়েছেন। ২০১৫ সালে ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে তৃষার সাথে ওর কলেজে দেখা করে আমি আর অভি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। তাই প্রতি বছর এই সময়টা যত এগিয়ে আসতে থাকে, তৃষার ভঙ্গুরতাও ততো বাড়তে থাকে। আমি ব্যক্তিগত সুখদুঃখ বড়ো একটা ভাগ করে নিতে পারি না, এটা আমার অক্ষমতাই বলতে পারেন। এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাও আমি এখনও মেনে নিতে পারিনি।’’

বন্যা আরও লিখেছেন, ‘‘গত তিন বছরে অনেকে এটা নিয়ে আমার সমালোচনা করেছেন। আমার ‘বাইরের হাসি’ দেখে কেউ কেউ বিরক্ত হয়েছেন, প্রকাশ্যে তা জানিয়েছেনও। একজন ব্লগার বন্ধু একদিন এও বললেন যে, আমি নাকি ‘কাওয়ার্ড', তাই নিজের একান্ত অনুভূতিগুলো সবার সাথে ভাগ করে নিতে ভয় পাই। হবে হয়তো! তবে এখনও আমার বিশ্বাস যে, কিছু একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি আছে, যেগুলো সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে গেলে, তারা তাদের গভীরতা হারায়। গভীরতার তাৎপর্য যে আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কতটা বেশী হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আর নতুন করে বলে কী লাভ। আমিই হয়তো ভুল, এসব সুক্ষ্ম মানবিক অনুভূতির হিসাব মেলানো বা এদের 'সঠিকতা/বেঠিকতা' নির্ণয় করা তো আর কোনও সহজ কাজ নয়।’’

জীবন আহমেদকে নিয়ে বন্যার স্ট্যাটাস

‘এই তিন বছরে অনেকের সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, কত মানুষের জীবন অহরহ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ছে—কখনও বিনা কারণে। আবার অনেক সময়েই মানুষের, সমাজের, দেশের বা বহু দেশের স্বার্থের কারণে। সেই ছিন্নভিন্ন অংশগুলোকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করতে করতেই জীবনের একটা বিশাল অংশ পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সুখদুঃখের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে সমাজ ও পৃথিবীকে একটু সাহস করে দেখতে শুরু করলে, একে অতীত, বর্তমান, ও ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে ফেলে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করলে নিজের কষ্টগুলো একটু হলেও কমে আসে—এটাই আমার শিক্ষা, গত তিন বছরে।’’