বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য এ নির্বাচনের ঘোষণাকে ছাত্র সংগঠনগুলো স্বাগত জানালেও এর ওপর ভরসা রাখতে পারছে না।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সভায় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঠিক করা হয়। সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে।
এর আগেও অন্তত আট বার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাসহ নির্বাচন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কোনোবারই নির্বাচন হয়নি। বিষয়টি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। গত ১৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দিতে নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু নির্বাচন না হওয়ায় ছাত্ররা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
জানা গেছে, ২৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে নির্বাচনের সময় ঠিক করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক তথ্য সংরক্ষণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। হলগুলোকে জানানো হয়েছে, সম্ভাব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি হলের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক তথ্য সংরক্ষণ করে আগামী মে মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে।
প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা মাথায় রেখে আমরা ডাকসু নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করেছি। আগামী ৩০ মে’র মধ্যে প্রতিটি হলের শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা জন্য প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক তথ্য সংরক্ষণ করার জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছে। আশা করি, আমরা আগামী মে মাসের মধ্যে সব তথ্য জমা দিতে পারবো।’
হাইকোর্টের নির্দেশনা সত্ত্বেও ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন কেন হচ্ছে না, জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক রব্বানি বলেন, ‘সে উত্তর এখন দিতে পারবো না। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু করেছি।’ প্রক্টর আরও জানান, নির্বাচনের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতির ঘাটতি নেই।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার একটি লক্ষ্য আমাদের আছে। এ জন্য প্রতিটি হলে শিক্ষার্থীদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আমরা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গেও আলোচনায় বসবো।’ এ ছাড়া নির্বাচনের অন্যান্য প্রস্তুতিও ঢাবি কর্তৃপক্ষের আছে বলে জানান তিনি।
ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
সময় ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সম্ভাব্য ডাকসু নির্বাচন। সব সংগঠনের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা করছেন তারা।
ছাত্রদল ঢাবি শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান চাই। ক্যাম্পাসে এক পক্ষীয় রাজনৈতিক প্রথা বাতিল করতে হবে। সব দলের সহাবস্থান না থাকলে ডাকসু নির্বাচন হবে কিনা, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। তবে নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুত।’
ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালত ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সে নির্দেশ অমান্য করছে। ডাকসু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসে রাজনীতির গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। নির্বাচন হলে আমরা প্রস্তুত আছি।’
ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে প্রশাসন ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন দিতে পারছে না। তবু আমরা খুশি যে এই নির্বাচনের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন হলে অন্যান্য সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলোর মতো আমরাও অংশ নেবো। এ নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা পাবে।’
ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরাও বলতে চাই, ডাকসু নির্বাচন হোক। ডাকসু নির্বাচন করা জন্য অনেক আগে থেকে প্রস্তুতি আমাদের আছে।’
নির্বাচনের পরিবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আছে। বাম সংগঠনগুলোসহ প্রায় সব সংগঠনের অবস্থান ক্যাম্পাসে আছে। যদি কোনও সংগঠনের অস্তিত্ব না থাকে, যদি তাদের ছাত্রত্বই না থাকে, তাহলে তারা ক্যাম্পাসে কীভাবে আসবে?’
‘ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন চাই’
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে ডাকসু সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য (রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ) ছাত্র সংসদ নির্বাচন করা জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সে নির্দেশ অমান্য করছে। কর্তৃপক্ষের উচিত দুই মাসের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া। এ ধরনের ঘোষণা অনেক শুনেছি। শিক্ষার্থীরা ঘোষণা চায় না, তারা নির্বাচন চায়।’
১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু ও ১৮টি আবাসিক হল সংসদের নির্বাচন হয়। এরপর গত ২৮ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নিয়মিত নির্বাচন হলেও ডাকসু নির্বাচন হয়নি।
আগের যত উদ্যোগ
১৯৯১ সালের ১২ জুন তখনকার ভিসি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু নির্বাচন হয়নি। এরপর ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করেন। পরিবেশ না থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়।
একইভাবে ১৯৯৫ সালেও ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের সময়সীমার কথা জানান। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় ব্যর্থ হন তিনি।
১৯৯৭ সালে বঙ্গবন্ধু হলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ছাত্রদল নেতা আরিফ হোসেন তাজ খুন হন। ওই ঘটনা তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৩ মে প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে ডাকসু ভেঙে দেওয়াসহ ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়। এরপর ২৭ মে সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী দু’বার নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েও সফল হননি।
দীর্ঘদিন পর ২০০৫ সালের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেন। কিন্তু তখনও নির্বাচন হয়নি। সর্বশেষ ২০১৫ সালে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি গঠন হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটিও ভিসির কাছে ডাকসু নির্বাচনসহ ১৯ দফা দাবি জানায়।
উল্লেখ্য, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ডাকসু সৃষ্টি হয়। এই সংসদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে মোট ৩৬ বার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ডাকসুর প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ডাকসুর সর্বশেষ ভিপি ও জিএস ছিলেন আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন।