১০ মাস ধরে বেতন বন্ধ, আন্দোলনে ডিএনএ ল্যাব কর্মকর্তারা

আন্দোলনরত ডিএনএ ল্যাব কর্মকর্তারা১০ মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির (এনএফডিপিএল)৬১ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর। বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা কর্মবিরতি পালন করছেন। এ কারণে সারাদেশের ডিএনএ ল্যাব বন্ধ রয়েছে। এতে নারী নির্যাতন মামলাসহ বিভিন্ন মামলা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ল্যাবের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশীষ কুমার মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘১০ মাস ধরে আমরা বেতন পাই না। কীভাবে কাজ করবো? গত বছর স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাদের বেতন-ভাতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি প্রকল্প পরিচালককে (পিডি)নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপরও আমরা বেতন-ভাতা পাচ্ছি না।’

তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে আমরা খুব মানবেতর জীবন-যাপন করছি। না খেয়ে ল্যাবে কাজ করা যায় না। আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু আর পারছি না। তাই বাধ্য হয়ে আন্দোলন করছি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা আন্দোলন করছি, এখনও কেউ খোঁজ নেয়নি।’

সারাদেশে মোট ৯টি ডিএনএ ল্যাব রয়েছে। যেখানে ৬১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে পরিচালিত মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রাম ভায়োলেন্স এগেইনিস্ট উইম্যান (এমএসপিভিএডব্লিউ) এর আওতায় এই প্রকল্পটি শুরু হয়।  

প্রকল্পটির কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৭ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণাললের সুপারিশ অনুযায়ী নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে এই ল্যাব প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ২০০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য এনএফডিপিএল কার্যক্রম শুরু করে। ধীরে ধীরে বিভাগীয় শহরগুলোয়ও এর বিস্তৃতি হয়। তবে শুরু থেকেই প্রকল্প আকারে চলতে থাকায় এতে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।

বর্তমানে ৬১ জনের মধ্যে ২২ জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ২২ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, বাকিরা কম্পিউটার অপারেটর। এছাড়াও প্রতিটি ল্যাবে একজন করে আউট সোর্সিং করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ল্যাবে কর্মরত আছেন ১৫ জন। ঢাকার বাইরে ৪৪ জন। ঢামেকে ছয় জন এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরের ল্যাবে দু’জন করে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কাজ করেন।  

ধর্ষণকারী শনাক্তকরণ, পিতৃত্ব, মাতৃত্ব, ভ্রাতৃত্ব, অভিবাসন, অজ্ঞাত ব্যক্তি, কিডনি দাতা-গ্রহীতার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়সহ বিভিন্ন বিষয় নির্ধারণ করে ডিএনএ। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৭ সেনা কর্মকর্তার, ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশন ট্র্যাজেডিতে নিহত ৫৭ শ্রমিক, ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে নিহত ৩২২ জন শ্রমিকের পরিচয় শনাক্ত করে এই ল্যাব। এছাড়াও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও এই ল্যাব ভূমিকা রাখছে।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশিষ মজুমদার তাদের দাবির বিষয়ে বলেন,‘ডিএনএ আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে হবে। বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি জানিয়েছেন, তিনি জানতেন বেতন-ভাতা নাকি আমাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আর এটা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত বিষয়টির অগ্রগতির বিষয়টিও তিনি জানেন না। আমরা কোথাও কোনও আশ্বাস পাচ্ছি না। আমাদের প্রজেক্ট ডিরেক্টরের কাছে যখন এ বিষয়ে জানতে চাই তিনি বলেন, বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এর বেশি কিছু জানাতে পারেননি। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের এই আন্দোলন।’

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ‘প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. আবুল হোসেনের অলসতার কারণে এই ঝামেলাটা হয়েছে। আমাদের রাজস্ব খাতের জন্য যে আবেদন করা হয়েছে, তাতে কোথাও তিনি উল্লেখ করেনি, আসলে কোথায় আমাদের স্থানান্তর করা হবে। এখানে অস্পষ্টতা রয়েছে। মন্ত্রী যখন বেতন-ভাতার জন্য আবেদন করতে বলেছিলেন তিনি তার ছয়মাস পর আবেদন করেছেন। এজন্যও ঝামেলা হয়েছে।’

এই ৯টি ডিএনএ ল্যাব ছাড়াও পুলিশের একটি ল্যাব রয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ২০১৪ সালে এই ল্যাবটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সেটিও প্রকল্প আকারে শুরু হয়। ২০১৫ সালে তাদের প্রকল্প শেষ হলেও সেখানে কাজ করা কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন একদিনের জন্যও বেতন-ভাতা বন্ধ হয়নি। তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের কাজ অনেকখানি অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান কর্মকর্তারা। তবে দেশের মেডিক্যাল কলেজের ল্যাব গুলোর বেতন ভাতা কীভাবে হবে, তার কোনও হদিস নেই বলেও তাদের অভিযোগ।  

২০১৭ সালের জানুয়ারিতেও এই প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আটকে যায়। পুনরায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে তাদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। ওই বছর তাদের বেতন-ভাতা ২৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হয়। তখন তারা আন্দোলন করলে প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির আশ্বাসে তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেন। তবে সেই সময় যে ল্যাবে কর্মরতদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই বলেও অভিযোগ করেন কর্মকর্তারা।

বর্তমানে প্রকল্পের চতুর্থ পর্ব চলছে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা জানান, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৬৯১টি মামলার বিপরীতে প্রায় ১৪ হাজার ৯৯৪টি নমুনার ডিএনএ প্রোফাইলিং করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব খাতে এই ল্যাবরেটরির মাধ্যমে ডিএনএ পরীক্ষার ফি বাবদ প্রায় ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় হয়েছে।

কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বন্ধের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এমনকি প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকিকেও একাধিকবার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।