‘পোশাক কোনোভাবেই যৌন হয়রানির কারণ নয়’

‘দেশে বেড়ে চলেছে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর খুন। কিন্তু এর পেছনে পোশাক কোনও কারণ নয়। ধর্মীয় শিক্ষা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নীতি-নৈতিকতার অভাব এবং ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াই ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির একমাত্র কারণ।’ বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ) ‘পোশাক বিতর্ক’ শীর্ষক বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিতে আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘মাত্র পাঁচ বছরের বাচ্চাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সেই বাচ্চার ধর্ষণের পেছনে কি পোশাকের দোহাই দেওয়া যাবে? একসময় আমাদের মা-বোনরা ব্লাউজই পরতেন না, তখন তো এভাবে ধর্ষণ হতে দেখিনি। তাহলে পোশাকই কীভাবে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে?’ 

তিনি বলেন, ‘হ্জ করতে গিয়েও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন অনেক নারী। তাহলে পোশাকই কি যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের একমাত্র কারণ? যখন কোনও শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়, তখন সেই অভিযুক্তকে বলা হয় তার মানসিক বিকৃতি। কিন্তু এই মানসিক বিকৃতি ট্যাগ লাগিয়ে তার অপরাধকে তুচ্ছ করা বা তার অপরাধকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। সম্প্রতি বিউটির ধর্ষণ এবং হত্যার সঙ্গে যে ক্ষমতার সম্পর্ক তাও স্পষ্ট। সে অনেক চেষ্টা করেও বাঁচতে পারেনি। সেটাকে কীভাবে বিচার করবেন?’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন

আরও পড়ুন: ‘৫ বছরের বাচ্চাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে, এর পেছনেও কি পোশাক দায়ী’

হেফাজতে ইসলামের শুরা সদস্য মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘কোরআনে স্পষ্ট করে বলা আছে কী ধরনের পোশাক পরতে হবে। ইসলামি শরিয়া মতে, স্পষ্টভাবে হাদিস-কোরআনে পর্দাকে নর ও নারীর জন্য ফরজ করা হয়েছে। কেন করা হয়েছে? নর-নারী পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, এটা তাদের জন্য স্বভাবজাত। আর এসব কারণেই পর্দা অবধারিত করা হয়েছে। খুব সহজভাবেই বলতে পারি,পোশাকের একটি সৌন্দর্যবোধ, শালীনতাবোধ আছে বলেই তো আমরা পোশাক পরি। পোশাক পরিধানের সঙ্গে বিষয়টির অবশ্যই একটি সম্পর্ক রয়েছে। আমি এটাও মানি, পোশাকই যে যৌন হয়রানির একমাত্র কারণ তা নয়, অন্য কারণও রয়েছে।’

হেফাজতে ইসলামের শুরা সদস্য মুফতি সাখাওয়াত হোসাইনতিনি বলেন, ‘পোশাকই যে একমাত্র দায়ী তা যেমন সঠিক নয়, তেমনি পোশাকই যে দায়ী নয় তাও কিন্তু নয়। যেমন, একজন মানুষ যখন কোনও যৌন উত্তেজক ছবি বা সিনেমা দেখে তখন সে সেই উত্তেজক অবস্থায় সে যার তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ঘরে বসে, সোফায় বসে সে যখন উত্তেজিত হয় তখন সে উন্মাদ হয়ে পড়ার পরে সে তার শত নীতি-নৈতিকতা বাদ দিয়ে নারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এখানেই ধর্ম শিক্ষা দিয়েছে, এটা করা যাবে না। সেটার জন্যই নিজেকে উত্তেজিত হতে বিরত রাখতে হবে, দৃষ্টিকে অবনত করতে হবে, কোনও পুরুষকে উত্তেজিত করে— এমন কোনও কিছু না হলে ধর্ষণের প্রবণতা কমে আসবে। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে নারীর পোশাক। পোশাকের মধ্যে যৌন উত্তেজনা তৈরি হয় এমন পোশাকও পরা উচিত নয়।’

আরও পড়ুন: পোশাকই যৌন হয়রানির একমাত্র কারণ নয়: মুফতি সাখাওয়াত

মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন আরও বলেন, ‘ইসলামে এদের জন্য শাস্তির বিধান আছে, মৃত্যুর পরে সেসব শাস্তি দেওয়া হবে। এছাড়া কেউ নিজে যখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সেখানে তার নানা মাসআলা দেওয়া হয়, তাকে বোঝানো হয়, নামাজ পড়ে দোয়া করে যেন সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’

নিউ আর্থ কিন্টারগার্ডেনের শিক্ষক ও নারী সাইক্লিস্ট সালমা আক্তার রুনী বলেন, ‘আমি মনে করি, যারা ধর্ষক তারা প্রতিনিয়ত ধর্ষণ করে। এটা তার স্বভাবের সঙ্গে মিশে রয়েছে। ফলে তার কাছে পোশাকই কারণ নয়। এটা মানি, পোশাকের একটা গুরুত্ব রয়েছে। তবে পোশাককে দায়ী করে মূলত অপরাধীকে পার করে দেওয়ার প্রবণতা কাজ করে। আর যদি পোশাকই একমাত্র কারণ হতো তাহলে মিডিয়ার নায়িকারা প্রতিনিয়তই ধর্ষণের শিকার হতেন, হলিউড-বলিউডের নায়িকারা ধর্ষণের শিকার হতেন।’

শিক্ষক ও নারী সাইক্লিস্ট সালমা আক্তার রুনীধর্ষকের শাস্তি না হওয়া ধর্ষণের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘দেশে আজ পর্যন্ত কতজন ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? বাংলাদেশে আইন অনুযায়ীও কি কারও শাস্তি হয়েছে? ধর্মীয় আইন অনুযায়ীও কি কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? কয়জনকে পাথর ছুঁড়ে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? কাউকেই তো সে অর্থে শাস্তি দেওয়া হয়নি বরং আমাদের আশেপাশে ধর্ষণের শিকার নারীরা তাদের ক্ষতের চিহ্ন মনে রাখে এবং ধর্ষকরা নিজেদের সেলিব্রেট করে। ফলে আমি মনে করি, পাঠ্যক্রমে যৌন হয়রানির প্রতিবাদ ও যৌনশিক্ষা, নৈতিক শিক্ষাও যুক্ত করতে হবে।’

আরও পড়ুন: ‘পোশাককে দায়ী করে মূলত অপরাধীকে পার করে দেওয়ার প্রবণতা থাকে’

লেখক ও মানবাধিকার কর্মী বৃত্বা রায় দীপা বলেন, ‘পোশাক নিয়ে যত বেশি বলবো তত বেশি ধর্ষণের অপরাধকে হালকা করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে যেখানে এক বছর পাঁচ মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছরের বৃদ্ধাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে, সেখানে পোশাক কীভাবে দায়ী? সম্প্রতি একজন পাগলী যে রাস্তার পাশে বাচ্চা প্রসব করেছে, সেই পাগলীর বিষয়ে কীভাবে পোশাককে দায়ী করা যায়? শুধু তাই নয়,বাচ্চা ছেলেরাও বলাৎকারের শিকার হচ্ছে। সেখানে শুধুই কি মানসিক বিকৃতি বলে পার করে দেবো, নাকি শুধুমাত্র পোশাককেই দায়ী করবো?’

লেখক ও মানবাধিকার কর্মী বৃত্বা রায় দীপাপোশাক ধর্ষণের কোনও কারণ নয় উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী বৃত্বা রায় বলেন, ‘ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই যদি বলি, ধর্ষকের ধর্ম কোনটা? ধর্ষকের জন্য কি শাস্তি? আমি চাই, ধর্ষকের কঠোর শাস্তির জন্য কথা বলতে হবে, সোচ্চার হতে হবে। এটা সামাজিক একটি ব্যাধি। ধর্ষককে সেফ করার জন্য সমাজপতিরা কাজ করে যায়। পোশাককে দায়ী করা হয়। কিন্তু তাদের যদি শাস্তি দেওয়া হতো, তাহলে কেউ এই অপরাধটা করতে গেলেও বারবার ভাবতো— এই কাজটি করা যাবে না, শাস্তির ভয়ে। কিন্তু তা কিন্তু হচ্ছে না। ফলে ধর্ষণের হার বেড়েই চলেছে।’

আরও পড়ুন: ‘দেড় বছরের শিশু থেকে বৃদ্ধাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে, সেখানে পোশাক কিভাবে দায়ী’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ষণ বিষয়টি আমরা সেক্সুলাইজ করছি, কিন্তু যেখানে এটাকে ক্রিমিনালাইজ করার কথা। আবার সেক্সুয়াল সিম্বলটাকে নারীর ওপর দেওয়া হয়েছে, তাকে মানুষ হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে না, সেক্সুয়াল প্রোডাক্ট করা হচ্ছে। আমাদের সমাজে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, নারী দেখলেই আকর্ষণ বোধ করি। এই ধর্ষণ বা অনিয়ন্ত্রিত আকর্ষণ বোধকে মানসিক বিকৃতি বলা যাবে না, এটা তো কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এই অনিয়ন্ত্রিত আকর্ষণ বোধ কেউ কি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না? আপনার লোভ হলো, ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাহলে যুগের পরিবতর্নের সঙ্গে সঙ্গে এত শিক্ষা, এত নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে লাভটা কী হলো?’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলামতিনি বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্বে বিভিন্ন গবেষণা আছে সেখানে ধর্ষণ আমাদের দেশের চেয়েও বড় সমস্যা। সেখানে এই ধর্ষণ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। ওসব গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক কোনও কারণ নয়, কারণ মানসিকতার। যেমন আমি ধর্ষণ করি না, তেমনি অনেক পুরুষই করে না। কিন্তু কেউ কেউ করে। যারা করে তারা বিশেষ শ্রেণির। নৈতিকতার অভাব রয়েছে তাদের। একসময় মানুষ পোশাকই পরতো না, মানুষের নীতি-নৈতিকতাবোধ ছিল না,তখন হলেও মানতে পারতাম, এখন তো সেই বন্য পরিবেশ থেকে আমরা সামাজিক মানুষ হয়েছি। তাহলে এখন কেন? শুধু তা-ই নয়,একজন প্রকৃত ধর্মভীরু মানুষ কি ধর্ষণ করতে পারেন?’ 

আরও পড়ুন: ধর্ষণকে ক্রিমিনালাইজ না করে সেক্সুলাইজ করা হচ্ছে: ডা. তাজুল ইসলাম

বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলাম বলেন, ‘আমি ধর্ষণের সঙ্গে পোশাকের সম্পর্কের বিষয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বুঝেছি, পোশাক বিতর্ক যখন ওঠে তখন কিন্তু কেবলই নারীকেন্দ্রিক পোশাক। পুরুষকেন্দ্রিক পোশাক নিয়ে কখনও কোনও বিতর্ক হয় না। ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির বিষয়ের সঙ্গে যদি শুধু পোশাককেই দায়ী করি, তাহলে সেটা যৌক্তিক হবে না। কারণ, আমার অনেক ধষর্ণের শিকার নারীকে দেখেছি, যেমন, নার্গিস, তনু, সর্বশেষ বিউটি— এরা তো কোনও যৌন-উদ্দীপক পোশাক পরেছিলেন না। সুতরাং যারা এই পোশাককে ধর্ষণের কারণ হিসেবে দাঁড় করাতে চান, তারা অপরাধকে ঢাকতে চান। আর এটা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফল।’

বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলামপোশাক বিতর্ক তৈরি করে রাখার উদ্দেশ্য হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে জিইয়ে রাখার জন্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এছাড়া বারবার যেটা বলা হচ্ছে, কেউ উত্তেজিত হলেই কেবল কারও ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এটা একদমই ঠিক নয়, কারণ উত্তেজিত হলেই কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে না— এটাও এক ধরনের শিক্ষা, এটাও ওই উত্তেজিত ব্যক্তির মাথায় রাখতে হবে।’
বৈঠকি সঞ্চালনা করেন মুন্নী সাহাবাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ আয়োজনটি সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে থেকেও বৈঠকি দেখা যায়। বৈঠকি সঞ্চালনা করেন মুন্নী সাহা। এতে আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও মানবাধিকার কর্মী বৃত্বা রায় দীপা, হেফাজতে ইসলামের শুরা সদস্য মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম, নিউ আর্থ কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ও নারী সাইক্লিস্ট সালমা আক্তার রুনী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন এবং বাংলা ট্রিবিউনের চিফ রিপোর্টার উদিসা ইসলাম।