না কেনার সুপারিশের পরও সেই ফগার মেশিন কিনছে ডিএসসিসি!

চলার কিছুক্ষণ পরই বন্ধ হয়ে যায় এই ফগার মেশিনগুলো (ফাইল ছবি)নানা ত্রুটি ও কার্যকর না হওয়ায় মশা নিধনে ব্যবহৃত ফগার মেশিন না কেনার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগকে সুপারিশ করেছিল সংস্থার স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, এসব মেশিন ব্যবহার উপযোগী নয়। কেনার কয়েক দিনের মাথায় ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অধিকাংশ যন্ত্র গরম হয়ে আগুন ধরে যায়। কিন্তু এরপরও নতুন করে আরও ৬০টি ফগার মেশিন ও ৩০০টি হস্তচালিত স্প্রে মেশিন কেনা হয়েছে। এ নিয়ে দুই দফতর ও মশক নিধন কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

অল্প সময়েই গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যায় ফগার মেশিনগুলো (ফাইল ছবি)মশা নিধন কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর এ বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়েছে, ‘মশক নিধন কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য ২০১৭ সালে ৮৩টি হোয়াইট ফগ মেশিন ক্রয় করা হয়। যার অধিকাংশই বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মেশিনগুলো পরিচালনার সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় আগুনও ধরে যায়। এতে কর্মীরাও ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মশক কর্মীদের জনরোষের সম্মুখীন হতে হয়। মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে এই জাতীয় মেশিন ভবিষ্যতে ক্রয় না করার জন্য সুপারিশ করা হলো।’

নিম্নমান ও অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় এসব ফগার মেশিন না কেনার সুপারিশ করেছে ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগকিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের এমন সুপারিশের পরও নতুন করে আরও ৬০টি ফগার মেশিন ও ৩০০টি হস্তচালিত স্প্রে মেশিন কেনা হয়েছে। গত ১১ মার্চ এসব মেশিন ডিএসসিসির ক্রয় ও ভাণ্ডার বিভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড থেকে সংগ্রহ করে। পাশাপাশি ওইদিন মেশিনগুলো পরীক্ষা করেও দেখা হয়। নতুন করে আরও অর্ধশত মেশিন কেনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ সিটির ওই প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য সংস্থার ৯৪০টি মেশিন রয়েছে। এরমধ্যে ৪৪২টি হস্তচালিত, ৪৪৭টি ফগার ও ৫১টি হুইল ব্যারো মেশিন। এর মধ্যে ২০৮টি হস্তচালিত মেশিন ও ১৮৬টি ফগার মেশিন পুরোপুরি এবং ১৬টি আংশিক অচল রয়েছে। এছাড়া ১৮টি হুইল ব্যারো মেশিন অচল রয়েছে। সব মিলিয়ে তিন ধরনের ৯৪০টি মেশিনের মধ্যে ৪২৮টি মেশিনই অচল। এর অধিকাংশই নষ্ট হওয়ার আগের এক বছরের মধ্যে কেনা হয়েছে। নষ্ট হওয়া এসব মেশিন মেরামত করতে যন্ত্রাংশও পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা এসব মেশিনের বেশিরভাগই নিম্নমানের।

অভিযোগ রয়েছে, সিটি করপোরেশনের প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা  (উপ-সচিব) মো. সাখাওয়াৎ হোসেন ও তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী সাহাব্বুদ্দিন মাতুব্বর এবং ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) লিয়াকত হোসেন সিন্ডিকেট করে স্বাস্থ্য বিভাগের ওই সুপারিশকে অগ্রাহ্য করে এই মেশিনগুলো ক্রয় করছেন। এসব মেশিনের দামও অনেক বেশি। ক্রয় করার পর এসব মেশিন একজন মাস্টাররোলের কর্মচারীর মাধ্যমে ভাণ্ডার বিভাগের গুদামে সংরক্ষণ করেন। বিষয়টি কোনও ভাণ্ডার রক্ষককে জানানো হয়নি।

এই তিনজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগও করেছেন সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

শুধু তাই নয়, গত ২৭ মার্চ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সহকারী সাহাবুদ্দিন মাতুব্বরকে মহানগর জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগদান করেননি। পরে তাকে নগর ভবনের বিদ্যুৎ বিভাগে বদলি করা হলে তিনি সেখানে যোগদান করে অফিস করছেন ভাণ্ডার বিভাগের আগের চেয়ারেই। মঙ্গলবারও (১০ এপ্রিল) তাকে ওই দফতরে অফিস করতে দেখা গেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সংস্থার স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা ও মশক নিধন কর্মীরা জানান, ফগার মেশিনগুলো ভাণ্ডার বিভাগের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে। আগে যেসব মেশিন ক্রয় করা হয়েছে, সেগুলো অনেক ভালো। একবার স্টার্ট করলে ৪০ মিনিটের বেশি চলে। ওজনেও হালকা। স্প্রে কর্মীরা কাঁধে বহন করে সহজেই চলতে পারেন। কিন্তু এখনকার মেশিনগুলো ৫-৭ মিনিট পর গরম হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। ওজনও অনেক বেশি। দামও বেশি। কিছু দূর যেতে না যেতে কর্মীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এতে ওষুধ ও সময় দুটোই নষ্ট হচ্ছে। কর্মীরাও কাজে গতি পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াৎ হোসেন কোনও কথা বলতে রাজি হননি। ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) মো. লিয়াকত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখনো মেশিনগুলো গ্রহণ করা হয়নি। ভাণ্ডার ও ক্রয় কমিটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।’

জানতে চাইলে ডিএসসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ফগার মেশিন ক্রয় কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শেখ সালাহ্উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বাস্তবতার নিরিখে এই মেশিনগুলো না কেনার জন্য একটা নোট দিয়েছি। কিন্তু ভাণ্ডার বিভাগ কী করেছে তা আমি জানি না। মেশিন কেনার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। আমি ওই কমিটির সদস্য হলেও এখন পর্যন্ত আমার নলেজে কিছুই আসেনি। এমন যদি হয়ে থাকে তা অবশ্যই আমি দেখব।’