করপোরাল পানিশমেন্ট বন্ধ হচ্ছে না কেন





করপোরাল পানিশমেন্ট (ইন্টারনেট থেকে নেওয়া প্রতীকী ছবি)স্কুলে বা বাড়িতে করা নানা ধরনের ভুলত্রুটি বা ছোটখাটো অন্যায়ের জন্য শিশুদের কান মলে দেওয়া, চড়-থাপড় মারা, বেত মারা বা অন্য যেকোনও ধরনের শাস্তি, এমনকি তাদের মানসিকভাবে নির্যাতন করাও ‘করপোরাল পানিশমেন্ট’। শিশুদের ওপর এসব নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে আইন রয়েছে। সরকারসহ বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজও করে যাচ্ছে। এরপরও কমছে না করপোরাল পানিশমেন্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনও ধরনের শারীরিক বা মানসিক শাস্তি শিশুদের জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে তারা ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতায় ভোগে। ক্ষেত্রবিশেষে বদমেজাজি হতে পারে তারা। এমনকি পরে মাদকাসক্ত হওয়াসহ নানা ধরনের অন্যায় কাজেও জড়িয়ে পড়তে পারে।
জন্মদিন পালন করায় সম্প্রতি রাজধানীর আইডিয়াল কলেজের ৯ ছাত্রকে রড দিয়ে পেটানোর ঘটনার পরে করপোরাল পানিশমেন্টের বিষয়টি নতুন করে আবারও আলোচনায় এসেছে। শিক্ষক ও অবিভাবকেরা মনে করেন, আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় শিশু নির্যাতন কমছে না।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর শিশু আইন-২০১৩ প্রণয়ন করে সরকার। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০৩ আছে। তবে এই দুই আইনে করপোরাল পানিশমেন্টের শাস্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। তবে ২০১১ সালে হাইকোর্ট করপোরাল পানিশমেন্ট সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকারকে শিশু নির্যাতন বন্ধে একটি নীতিমালা করার নির্দেশ দেন।
পরে জাতীয় শিশু নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৩ সালের শিশু আইনেও শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে আইনি নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই আইনের ৭০ ধারায় বলা হয়েছে,যদি কেউ নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে শিশুদের ওপর নির্যাতন,দুর্ব্যবহার,অবহেলা অথবা বরখাস্ত করে এবং এসবের কারণে যদি শিশুটির স্বাস্থ্যের কোনও ক্ষতি হয়,তাহলে সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।
দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ করে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার দুটি আদেশ জারি করে। আদেশে প্রতিষ্ঠানের যেসব শিক্ষক শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেন তাদের চিহ্নিত করতে এবং এটা বন্ধ করতে প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। আদেশে বলা হয়, কোনও শিক্ষক যদি এ ধরনের পানিশমেন্ট দেন তাহলে ওই শিক্ষককে সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে দেশে তিন হাজার ৮৪৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে এক হাজার ৭১০ শিশু। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮৯৪ জন। এ হিসাবে গড়ে প্রতিমাসে হত্যা করা হয়েছে ২৮ শিশুকে এবং ৪৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন কমানো যাচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক অমূল্য কুমার বৈদ্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্কুলে শিশুদের নির্যাতনের ঘটনা একসময় বেশি ছিল। শিক্ষক বেত ছাড়া ক্লাসেই যেতেন না। কিন্তু সেই চিত্র এখন আর নেই। তবে এটা ঠিক, নানা অজুহাতে শিশুদের শিক্ষকেরা ক্লাসে শাস্তি দেন না তা কিন্তু একদমই নয়।’ এটা নির্মূল না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। অমূল্য কুমার বৈদ্য বলেন, ‘প্রথমত, স্কুলে আসার আগে একজন শিশু পরিবার থেকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো শিক্ষাই পায়। পরিবারের শিক্ষা এবং একজন শিক্ষককের শিক্ষার মধ্যে বেশ খানিকটা পার্থক্য রয়েছে। পরিবার থেকে কোনও শিশু যদি বড়দের সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা, সদাচরণ, ভদ্রতার প্রাথমিক ধারণা পায় তাহলে শিক্ষকদের জন্যেও ওই শিশুকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু যখন কোনও শিশু তার পরিবার থেকে ইতিবাচক আচরণের শিক্ষা পায় না তখন স্কুলের শিক্ষকেরা আর কতখানিই বা তাকে এসব শেখাতে পারেন? এছাড়া ওই শিশুর সঙ্গে পরিবার এবং শিক্ষকরা যে আচরণ করেন, সেও বড় হয়ে একই আচরণ করে। যেমন, কোনও শিশু যখন সারাজীবন স্কুলে মার খেতে বড় হয় এবং কোনও স্কুলের শিক্ষক হয় তখনও তার ভেতর প্রবণতা থাকে শিক্ষার্থীদের মারধর করার। ফলে আমি মনে করি, পরিবার থেকে শিক্ষা যেমন অন্যতম, তেমনি সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিশুদের যেসব শিক্ষক ও অভিভাবক পেটান তাদের আইন অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে।’ শাস্তি হলে এ ধরনের অপরাধের প্রবণতা কমবে বলে মত দেন তিনি।
ধানমন্ডির আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আব্দুল আলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইডিয়াল কলেজের এই ঘটনা আমাকে অনেক আতঙ্কিত করেছে। এভাবে কোনও শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের পেটাতে পারে? আমার সন্তানও ওই স্কুলেই পড়ে। আমি তো এখন রীতিমতো আতঙ্কিত। কখন যেন আমার সন্তানকে এভাবে মারধর করে। আমি চাই, আইডিয়াল কলেজের ওই শিক্ষকের শাস্তি হোক। শাস্তি হলেই অন্যরা এমন মারধর করতে সাহস পাবেন না।’
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুস শহীদ মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করপোরাল পানিশমেন্ট প্রতিরোধে দেশে আইন রয়েছে, উচ্চ আদালতেও জাজমেন্ট রয়েছে। কিন্তু সে আইন খুব একটা কার্যকর দেখা যায় না। মূলত সমস্যা রয়েছে বিচারহীনতার প্রবণতায়। আইন থাকলেই তো হবে না, আইন অনুযায়ী যথাযথ বিচার হতে হবে, দোষীর শাস্তি হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের কোনও শিশুকে নির্যাতন করার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকে। যেমন, ওই শিক্ষকের রাজনৈতিক ক্ষমতা বা স্কুলের অন্য শিক্ষক অথবা ম্যানেজিং কমিটির প্রভাব তার ওপর থাকে। সে নিজেকে ক্ষমতাবান মনে করেন। ধরাকে সরা জ্ঞান করেন।’
স্কুলে পড়াশোনা ও খেলাধুলার জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকাও শিশু নির্যাতনের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন আব্দুস শহীদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘এছাড়া নির্যাতনের হার না কমার অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতা। এই বিচারহীনতার কারণেই শিক্ষকেরা শিশুদের নির্যাতনে সাহস করেন। অভিযুক্ত শিক্ষককেও বাঁচানোর পাঁয়তারা করেন স্কুলের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা। বিচার করলেও বড় জোর তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু এতে লাভ কী? আইন অনুযায়ী তার জেল-জরিমানা হওয়া উচিত। তবেই শিশু নির্যাতনের প্রবণতা কমবে।’
সম্প্রতি রাজধানীর আইডিয়াল কলেজের ৯ ছাত্রকে রড দিয়ে পেটানোর ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষ ও বিচার বিভাগের উচিত ওই শিক্ষককে আইন অনুযায়ী বিচার করা, শাস্তি দেওয়া। তাকে জেল-জরিমানা করা। তাহলে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে থাকবে। শাস্তি না হলে দৃষ্টান্ত স্থাপনও হবে না।’
করপোরাল পানিশমেন্টের কারণে একজন শিশুর মানসিকতার ওপর কেমন প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমদ চৌধূরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত এই ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ এ কারণেই করা হয়েছে যে শিশুদের যেকোনও ধরনের শারীরিক শাস্তি তার জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট তৈরি করে।’
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। একজন শিশু তার বয়স অনুপাতে কিছু কিছু শারীরিক শাস্তি সহজভাবে নিতে পারে না। সেটা বুঝতে হলে তার বয়স, কত সময় ধরে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এবং কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, সেসব আমলে নিতে হবে। অনেক শিশু আছে যাদের বয়স হয়তো ১৫ বছর, অথচ সে কখনও শারীরিক অথবা সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েনি। অথচ ১৫ বছর বয়সে সে এমন একটি শাস্তি পেলো তাতে তার মানসিকতার ওপর অনেক খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।’
তিনি বলেন,‘সাধারণত এসব শিশু এগুলো মেনে নিতে না পারলে হয় ডিপ্রেশনে ভোগে অথবা খুবই রাগী হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা মাদকাসক্তসহ নানা রকম খারাপ কাজেও জড়িয়ে পড়তে পারে।’