হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা বলেছেন, ‘অপহরণের পর আমরা অকথ্য মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি; প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবো কিনা, নিশ্চিত ছিলাম না। অপহরণের ঘটনা ছিল পরিকল্পিত। নব্য মুখোশধারী বাহিনী ও জেএসএস এমএন লারমা দলের একটি গোষ্ঠী মিলিতভাবে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে।’
রবিবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক নিপীড়নবিরোধী ১৯ সংগঠন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির কুতুকছড়ি থেকে অপহৃত হন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা ও আরেক নেত্রী দয়াসোনা চাকমা। ১৯ এপ্রিল খাগড়াছড়ি শহরের এপিবিএন স্কুল গেটে তাদের ছেড়ে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা।
মন্টি চাকমা বলেন, ‘আন্দোলনের চাপেই তারা আমাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ছেড়ে দেওয়ার আগে নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে তারা হাস্যকর নাটক করে, আমাদের দিয়ে ভিডিও রেকর্ড করিয়ে তাদের শেখানো কথা বলতে বাধ্য করায়। আমাদের সঙ্গে ছবিও তুলেছে। কাছে থেকে আমরা তাদের কাণ্ড-কারখানা দেখেছি, তাদের হাঁড়ির খবর জেনেছি। তাদের ব্যাপারে আমাদের যে সন্দেহ ছিল, অপহৃত হয়ে আমরা তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছি। নাটেরগুরু আর খেলারামদের চিনে ফেলেছি আমরা, যা পর্যায়ক্রমে উত্থাপিত হবে।’
১৯ সংগঠনের পক্ষে সংক্ষিপ্ত এক লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন– হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরূপা চাকমা। এরপর ৩৩ দিনের জিম্মি থাকার দুঃসহ অভিজ্ঞতা লিখিতভাবে সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন মন্টি চাকমা। এসময় দয়াসোনা চাকমাও উপস্থিত ছিলেন।
মন্টি চাকমা আরও বলেন, ’দেশবাসীর কাছে সত্য ঘটনা তুলে ধরায় আমার পরিবারের ওপর সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়েছে। আমার বাবা ও বড় ভাইকে নব্য মুখোশধারী বাহিনীর সর্দার তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা প্রতিনিয়ত মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। তারা এখন পালিয়ে রয়েছে। আমার পরিবারকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ভয় দেখাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বর্মা আমাকে যেখানে পাবে সেখানে মেরে ফেলবে বলে আমার মাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছে। আমার ও দয়াসোনার পরিবার চরম নিরাপত্তহীনতায় রয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলন থেকে ১৯ সংগঠনের নেতাকর্মীরা অপহরণকারীদের গ্রেফতারে প্রশাসনের কোনও উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন। তারা বলেন, অপহরণের পাঁচ দিন পর দয়াসোনা চাকমা বাদী হয়ে রাঙামাটির কোতোয়ালী থানায় আসামিদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে মামলা করলেও পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেফতার করেনি। এমনকি, অপহরণের বিষয়ে তাদের কোনও তৎপরতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমা মুক্তি পাওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও খোঁজ-খবর নেওয়া হয়নি। এতে প্রমাণিত হয়, অপহরণের ঘটনায় বিশেষ শক্তিশালী গোষ্ঠী বা প্রশাসনের যোগসাজস রয়েছে।
তারা আরও বলেন, ১৯ সংগঠনের মধ্যে ঐক্য বজায় থাকবে এবং পাহাড়-সমতলে নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। অপহরণকারীদের গ্রেফতার করা না হলে আবারও একযোগে রাজপথে নামার ও যৌথ কর্মসূচি ঘোষণার কথাও জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ১৯ সংগঠনের পক্ষে থেকে ৮ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো– অনতিবিলম্বে অপহরণকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, মন্টি ও দয়াসোনা চাকমার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপহরণকারী ও তাদের মদদদাতাদের গ্রেফতার ও বিচার, পাহাড় ও সমতলে ঘটা সব ধর্ষণ-গুম-খুন-অপহরণের বিচার, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অঘোষিত সেনা শাসন প্রত্যাহার, পার্বত্য চট্টগ্রামে ধরপাকড়-নিপীড়ন-নির্যাতন-হয়রানি বন্ধ করা, সন্ত্রাসী অপকর্মে রাষ্ট্রীয় মদদ বন্ধ করা, পাহাড় ও সমতলে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা।
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরূপা চাকমার সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন– সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু, নারী সংহতির সাংগঠনিক সম্পাদক জান্নাতুল মরিয়ম, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদউস, বিপ্লবী নারী ফোরামের সদস্য আমেনা আক্তার, বিপ্লবী নারী মুক্তির আহ্বায়ক নাসিমা নাজনীন, সিপিবি নারী সেলের সদস্য জলি তালুকদার, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সভাপতি বিনয়ন চাকমা, ছাত্র ঐক্য ফোরামের যুগ্ম-আহ্বায়ক সরকার আল ইমরান, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি এমএম পারভেজ লেলিন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবীর, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সহ-সভাপতি সাদেকুল ইসলাম, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য হযরত আলী, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জিকো ত্রিপুরা প্রমুখ।