বকেয়া বেতন দেওয়ার দিন আশিয়ানা গার্মেন্টসে আগুন!





এমএল টাওয়ারবকেয়া বেতন দেওয়ার দিনই রাজধানীর রামপুরার আশিয়ানা গার্মেন্টসে আগুন লাগা নিয়ে শ্রমিকদের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের ধারণা, বেতন না দেওয়ার জন্যেই মালিকপক্ষ ষড়যন্ত্র করে কারখানায় আগুন লাগিয়েছে।
রবিবার (২৯ এপ্রিল) দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে রামপুরায় ওয়াপদা রোড এলাকার এমএল টাওয়ারের আশিয়ানা গার্মেন্টসে আগুন লাগে। ওই ভবনের ষষ্ঠতলায় গার্মেন্টসের ফেব্রিক্সের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের ধারণা। ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট চেষ্টা করে বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। রামপুরা এলাকার এমএল টাওয়ারের মালিক আলাউদ্দিন। আর আশিয়ানা গার্মেন্টসের মালিকের নাম মো. শাহিন।
পোশাক কারখানাটিতে ৬০০ থেকে ৭০০ শ্রমিক কাজ করেন। দুই মাস ধরে শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রয়েছে। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন নিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে অসন্তোষ চলছিল। শতাধিক শ্রমিককে বকেয়া দেওয়া হলেও অধিকাংশ শ্রমিকদের বেতন বা রবিবার দেওয়ার কথা ছিল। দুপুরে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বেতন-ভাতা না পাওয়া শ্রমিকেরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, পাওনা বেতন-ভাতা না দিতেই চক্রান্ত করে গার্মেন্টসের গোডাউনে আগুন লাগানো হয়েছে। আগুন নিভে যাওয়ার পর ফেব্রিক্সের গোডাউনে তারা দেখেছেন, একটি বড় কাপড়ের রোল কেরাসিন তেলে ভেজানো ছিল। সেখানে একটি তেলের গ্যালনও দেখা গেছে। তাদের ধারণা, হয়তো কেউ ষড়যন্ত্র করে আগুন লাগিয়েছে। যাদের বেতন ৭ হাজারের নিচে তারা বাৎসরিক ছুটির টাকাসহ বকেয়া পেয়েছেন,যাদের বেতন ৭ হাজারের বেশি তারা টাকা পাননি।
কারখানার আয়রনম্যান মোহাম্মদ সায়েম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ভবনের চতুর্থ তলায় কাজ করি। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সঙ্গে আমরাও আগুন নেভাতে কাজ করি। আগুন নিভে যাওয়ার পর ৬ষ্ঠতলার পরিস্থিতি দেখতে যাই। তখন সেখানে একটি কাপড়ের রোল দেখতে পাই, যেটা পুরোটা কেরোসিনে ভেজা ছিল। সেখানে একটি কেরোসিনের ডিব্বাও ছিল।’
তবে তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের কারণ বলতে পারেননি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তবে আগুনের সূত্রপাতের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভবনের পাঁচ থেকে সাততলা পর্যন্ত তিনটি তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওপরের তলাগুলোয় খুব একটা ক্ষতি হয়নি। গার্মেন্টসের মধ্যে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকলেও এগুলো ব্যবহারে কেউ পারদর্শী ছিলেন না। ভবনের পেছনের বহির্গমনের পথে কোনও লোক ছিল না।
অসহায় শ্রমিকেরাফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন সাংবাদিকদের বলেন, ‘রবিবার দুপুর ১টা ৪৭ মিনিটে ফেব্রিক্সের গোডাউন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হই। কীভাবে আগুন লেগেছে তা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।’
৯ বছর আশিয়ানা গার্মেন্টসে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করেন আশা আক্তার সালমা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেতন ভাতা নিয়ে এই মাসের ঝামেলা হয়। মালিকপক্ষ ২৫ এপ্রিল শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেবে বলে জানায়। কিন্তু দেয়নি। ওইদিন আমরা গার্মেন্টসে আসলেও বেতন-ভাতা না পেয়ে দুপুরের পর থেকে কাজ বন্ধ রাখি। আজ বেতন-ওভার টাইমের টাকা দেওয়ার কথা ছিল। মালিক কিছু কর্মীদের দিয়েছে। বাকি শ্রমিকদের টাকা লাঞ্চ টাইমের পরে দেওয়ার কথা ছিল। তাই আমরা অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু দুপুরে তো গার্মেন্টসে আগুন লাগে।’
এমএল টাওয়ারটি আবাসিক ভবন হিসেবে রাজউকের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া। সেখানে অবৈধভাবে পোশাক কারখানা করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এমএল টাওয়ারের পাশেই বেটার লাইভ হাসপাতালের অন্তত ৩০টি ডায়ালিসিসের মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও গা-ঘেঁষে থাকা হাসপাতাল ভবনের দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বেটার লাইভ হাসপাতালের মালিক আব্দুল কাইয়ুম মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থাকার কোনও অনুমোতি নেই। কিন্তু নিয়ম না মেনেই এমএল টাওয়ারে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ভাড়া দেওয়া হয়। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের হাসপাতালের রোগীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’