হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দিয়েছিল যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ

নিহত শাকিলএকটি হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিক মৃত্যু উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। বাদীর নারাজির পর মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব পায়। পুলিশের নতুন এই তদন্ত বিভাগ ছয় মাস তদন্ত শেষে জানতে পারে এটি হত্যাকাণ্ড। তারা দুই আসামিকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ১৪৭/১ দক্ষিণ যাত্রাবাড়ির বাসা থেকে মির্জা শাকিল নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মির্জা শাকিল দোহার দক্ষিণ জয়পাড়ার নুরুল ইসলামের ছেলে। যাত্রাবাড়ীতে সে যে বাসাটিতে ভাড়া থাকতো সেটি তার পরিবারের কেউ চিনতো না। শাকিলের লাশ উদ্ধারের পর তার বোনজামাই রুবেলকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে জানানো হয়, শাকিলের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে। এরপর শাকিলের বাবা ও দুই বোনজামাই ঢাকা মেডিক্যালে আসেন।

নিহত শাকিলের বড় ভাই মির্জা মহসিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শাকিল যে যাত্রাবাড়ীর বাসায় ভাড়া ছিল, সেটি আমাদের পরিবারের কেউ জানতো না। আমরা জানতাম তার এক বন্ধুর সঙ্গে সে থাকতো। বাড়ি থেকে টাকা নিতো। ফোনে কথা হতো তার সঙ্গে। দোহায় বেশি একটা যেত না।’

তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি দুপুরের দিকে আমার বোনজামাইকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে জানানো হয় শাকিল মারা গেছে। তখন পরিবারের সবাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন। এরপর আমার বাবা যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের সঙ্গে ওই বাসাটিতে যান। সেখানে তখন কেউ ছিল না। এরপর ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দাফন করা হয়।’

গ্রেফতার আলেয়াপরে শাকিলের পরিবার জানতে পারে, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ওই বাড়িটিতে তার স্ত্রী, এক সন্তান ছিল ও এক বন্ধুও তার সঙ্গে ছিল। তবে শাকিলের মৃত্যুর পর তাদের আর পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর নিহত শাকিলের পরিবারের মনে সন্দেহ জাগে। পরিবার জানতে পারে তার বন্ধুর নাম ইব্রাহীম (৩০) ও শাকিলের স্ত্রী পরিচয় দানকারীর নাম আলো আক্তার আলেয়া (২৬)। এরপর এই দুজনের নাম উল্লেখ করে শাকিলের বাবা নুরুল ইসলাম ঘটনার একমাস ১৩ দিন পর ২০১৬ সালের ৮ মার্চ যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ২০।

শাকিলের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলাটি তদন্ত করেন যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নয়ন কারকুন। তবে কোনও আসামিকে তিনি গ্রেফতার করেনি। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে শাকিলের মৃত্যুর কোনও কারণ লেখা হয়নি। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা নয়ন কুরকান আসামিদের অব্যাহতি দিয়ে ২০১৭ সালের ৩১ মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করেন। যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ মামলাটি এক বছর দুই মাস তদন্ত করে। তাদের ফাইনাল রিপোর্টের বিরুদ্ধে মামলার বাদি আদালতে নারাজি দেন। আদালত ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর মামলাটি পিবিআই’কে তদন্তের নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশের পর পিবিআই ঢাকা মেট্রোর উপপরিদর্শক (এসআই) হুমায়ুন কবির মোল্লা মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান। তিনি পাঁচ মাস ধরে মামলাটি তদন্ত করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পান।

আলো আক্তার আলেয়ার মা শাকিলদের দোহারের বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। সেই সুবাদে শাকিলের সঙ্গে আলেয়ার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আলেয়া দোহারের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেছেন। প্রেমের সম্পর্ক জানাজানি হওয়ার পর আলেয়াকে মালয়েশিয়া প্রবাসী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। এরমধ্যে তাদের আর কোনও যোগাযোগ হয়নি। এরমধ্যে আলেয়া দুই সন্তানের মা হন। আলেয়ার স্বামী ফের বিদেশ চলে যায়। এরমধ্যে আলেয়া ও শাকিলের ফের যোগাযোগ হয়। তারা ফের সম্পর্কে জড়ায়। এরপর শাকিলের সঙ্গে ছোট সন্তান নিয়ে পালিয়ে ঢাকায় আসে। এতে ইব্রাহীম তাকে সহযোগিতা করে। দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর ওই বাসাটিতে তারা ভাড়ায় উঠে। শাকিল, ইব্রাহীম, আলেয়া ও তার ছোট্ট মেয়েটি ওই বাসায় থাকতে শুরু করে। এরমধ্যে এক ব্যক্তিকে কাজী সাজিয়ে আলেয়ার আগের স্বামীকে ডিভোর্স দেয় তারা। শাকিলের সঙ্গে আলেয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। এর সব কাগজপত্রই ছিল নকল।

পিবিআই তদন্তে জানতে পারে, শাকিলের ভাই ইতালী প্রবাসী থাকায় তার টাকা পয়সার অভাব ছিল না। তাদের পরিবারটি স্বচ্ছল। বাড়ি থেকে শাকিল টাকা নিতো। তা দিয়ে ওই বাসায় বসে ইব্রাহীম ও অন্যান্য বন্ধুরা ফূর্তি করতো, নেশা করতো। এভাবেই তাদের সময় চলে যায়। এরমধ্যে ইব্রাহীমের সঙ্গে আলেয়ার সম্পর্ক হয়ে যায়। নাহিদ নামে যাত্রাবাড়ীর আরেক বন্ধুর মাধ্যমে শাকিল বিষয়টি জানতে পারে। এমনকি কয়েকদিন শাকিলের সামনেও বিষয়টি ধরা পড়ে। তখন শাকিল তার বন্ধু ইব্রাহীমকে বিষয়টি নিষেধ করে, তাকে বাসা থেকে চলে যেতে বলে। এরপর ইব্রাহীম ওই বাসা থেকে চলে যায়।

গ্রেফতার ইব্রাহীমইব্রাহীম বাসা থেকে চলে যাওয়ায় শাকিল মাদক সেবন ও আড্ডা দেওয়ার লোক পাচ্ছিল না। যেহেতু তাদের মধ্যে অপরাধ জগতের সখ্যতা ছিল, তাই ইব্রাহীমের সঙ্গে আবার পুনরায় বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়ানোর চেষ্টা করে শাকিল। একদিন ইব্রাহীমকে ফোন দিয়ে বাসায় পার্টির আয়োজন করে শাকিল। আর সেই দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি। ওইদিন শাকিল, ইব্রাহীম, রবিন ও নাহিদ একত্রে বাসায় মদ পান করে এবং শাকিলের স্ত্রী আলেয়াও মদ খায়। এরপর রাত ২টার দিকে নাহিদ ও রবিন বাসায় চলে যায়। আলেয়া ও শাকিল তাদের রুমে ঘুমিয়ে পড়ে। ইব্রাহীম বাসায় একাই থাকেন। সকালে সে-ও বাসা থেকে চলে যায়। এদিকে শাকিল মদ খাওয়ার পরদিন থেকে বমি করছিল। ২৭ জানুয়ারি শাকিলের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। এরপর ইব্রাহীমকে বিষয়টি জানায় আলেয়া। তখন ইব্রাহীম ফের বাসায় আসে। তার সঙ্গে আরও একজন লোক আসে। তখন তারা শাকিলকে একটি সিরাপ খাওয়ায়। সিরাপ খাওয়ানোর পর অবস্থা আরও খারাপ দেখে ইব্রাহীম শাকিল ও আলেয়াকে বাসায় রেখে দরজার বাইরে কলাপসিবল গেটে তালা মেরে পালিয়ে যায়; যাতে ইব্রাহীমকে কেউ হাসপাতালে নিয়ে যেতে না পারে। এরপর আলেয়া চিৎকার শুরু করে। তখন আশেপাশের লোকজন তালা ভেঙ্গে শাকিলকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পিবিআই ঢাকা মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বলেন,  ‘এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। শাকিলকে পরিকল্পনা করেই হত্যা করা হয়। এতে সহযোগিতা করে আলেয়া। হাসপাতালে শাকিলকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণার পরই ইব্রাহীমের সঙ্গে আলেয়া পালিয়ে যায়। তারাই অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে আবার শাকিলের পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানায়।’

ঘটনার পর কিছুদিন আলেয়া পালিয়ে থাকলেও পুনরায় সে তার আগের স্বামীর সঙ্গে গিয়ে থাকা শুরু করে।  গত ২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাকে দোহারের দক্ষিণ জয়পাড়া থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই। আদালতে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধি দেয়। পরদিন ২৯ এপ্রিল পিবিআই সদস্যরা ইব্রাহীমকে যাত্রাবাড়ীর ধোলাইপাড় এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই হুমায়ুন কবির মোল্লা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দুইজনকে গ্রেফতার করেছি। এদের মধ্যে আলেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধি দিয়েছে। ইব্রাহীম দুই দিনের রিমান্ডে আছে। এছাড়াও নাহিদ নামে অপর একজন সাক্ষী দিয়েছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আসামির স্বীকারোক্তিতে তাই মিলছে এখন পযন্ত।’

এ রকম হত্যাকাণ্ড যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের তদন্তে কেন আসলো না? জানতে চাইলে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ও যাত্রাবাড়ী থানার এসআই নয়ন কারকুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ময়নাতদন্তের ওপর ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছি। হত্যার বিষয়ে কিছু পাইনি। এখন যদি তদন্তে কিছু পায় তাহলে তো ভালো। পিবিআই আমাদের একটি ইউনিট।’

যাত্রাবাড়ী থানার এই তদন্ত কর্মকর্তা ফাইনাল রিপোর্টে লিখেছেন, মৃত্যুর কোনও সঠিক কারণ জানা যায়নি। বাদি ভুল বুঝে মামলাটি করেছে। এটি তথ্যগত ভুল। আসলে তার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক।

নিহত শাকিলের পরিবারের প্রশ্ন, যদি শাকিল মদ খেয়ে মারা যায়, তাহলেও তা ময়নাতদন্তে আসা উচিৎ ছিল। কিন্তু কোনও কারণই আসেনি। তাদের কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক হিসেবে প্রতীয়মান হয়। কারণ যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ মামলাটির তদন্তে উল্লেখযোগ্য কিছুই করেনি।

গ্রেফতার ইব্রাহীম যুবলীগ নেতা মিল্কী হত্যার সাত নম্বর নামীয় আসামি। তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজী ও হত্যাচেষ্টা মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।