বিএসএমএমইউ: ১৭ বছরে দেড় হাজার হাঁটু ও কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন

বিএসএমএমইউসিরাজ হোসেন (৭৬) পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ছেলেমেয়েরা ব্যবসা দেখলেও নিজেও ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করেন তিনি। দিনে দিনে হাঁটুর ব্যথা বাড়তে থাকায় তাকে সন্তানেরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা তার হাঁটুর অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। এটি প্রতিস্থাপনের পর তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করছেন। সিরাজ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার তো এ বিষয়ে কোনও ধারণা ছিল না। চিকিৎসকের পরামর্শে আমি এই চিকিৎসা নিয়েছি। এখন আমি ভালো আছি, আগের সেই ব্যথাটা নেই।’ ইতোমধ্যেই স্বল্প খরচে হাঁটু ও কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন করে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে (বিএসএমএমইউ)। রোগীদেরও আস্থা অর্জন করেছে এ প্রতিষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউর প্রক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘আমরা কয়েকবছর ধরে বেশ সফলতার সঙ্গেই হাঁটু ও কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ যেহেতু চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাচ্ছে, কৃত্রিম কোমর বা হাঁটুর ইমপ্ল্যান্ট দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব। দেশে উৎপাদন করলে খরচটা কিছুটা হলেও কমে আসবে। তবে দেশে রিপ্লেসমেন্ট রোগীর হার অনেক কম।’ 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসন থেকে নেওয়া ইমপ্ল্যান্ট দিয়ে অস্থি প্রতিস্থাপন করায় কোমরের কৃত্রিম অস্থিসন্ধির ক্ষেত্রে খরচ পড়ছে এক থেকে চার লাখ টাকা। তবে দেশীয় কোনও কোম্পানি এই ইমপ্ল্যান্ট উৎপাদন করতে পারলে ব্যয় কমাবে বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসকরা জানান, যখন কোনও রোগীর অস্থিসন্ধিগুলো সাধারণ ওষুধের মাধ্যমে সুস্থ রাখা সম্ভব হয় না, তখনই কৃত্রিম অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন করা হয়।
বিএসএমএমইউর অর্থোপেডিক ডিপার্টমেন্টে ২০০১ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে কোমর ও হাঁটুর অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন শুরু হয়। এরপর ২০০৬ সাল থেকে কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়। এখন প্রতি সোমবার ও বুধবার এই দুদিন এই অস্ত্রোপচার করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ রোগীর হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং এক হাজার জন রোগীর কোমরের অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। 
সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বীরু তার দুজন সহকর্মীকে নিয়ে এই প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করে থাকেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে হাঁটু প্রতিস্থাপন করতে চাইলে বিএসএমএমইউতে করলে অন্যখানের চেয়ে খরচ কিছুটা হলেও কম হয়। কোনও রোগী এখানে প্রতিস্থাপন করতে চাইলে তাকে ইমপ্ল্যান্ট কিনতে হয়, ওষুধ কিনতে হয়। আমরা রোগীর অস্ত্রোপচারের চার্জটা নেই না। অন্য হাসপাতালের চেয়ে এখানে এক-দেড় লাখ টাকা সাশ্রয় হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ইউনিটে একজন অধ্যাপক,  দুজন সহযোগী অধ্যাপকসহ প্রায় ২০ জন মিলে কাজ করি। এই অস্ত্রোপচার অত্যন্ত উচ্চদক্ষতা সম্পন্ন হয়েই করতে হয়। তাই সবাই এটা করার রিক্স নিতে চায় না।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণত আর্থ্র্রাইটিসের রোগীদের বেশি এই চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হয়। যারা আর্থ্রাইটিসের কারণে হাঁটতে পারে না, যাদের হাড়ের স্পেস কমে গেছে,  হাড় বাঁকা হয়ে গেছে, ওষুধে কাজ হয় না এই ধরনের রোগীদের বেশি এই চিকিৎসা নিতে হয়। একসময় শুধু বয়স্ক নারীদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা দেখা দিত কিন্তু এখন বাতজনিত রোগে, মাতৃত্বকালীন জটিলতার কারণে কোনও কোনও নারীর এই চিকিৎসা প্রয়োজন হচ্ছে। হাঁটু বা কোমর অকেজো হয়ে গেলে নারীর স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে এই সেবার প্রয়োজন হয়।’
এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউর সহকারী অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ কুমার কুন্ডু বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে মানুষের অস্থিসন্ধি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। রোগীর অস্থিসন্ধি নষ্ট হয়ে গেলে তার পঙ্গুত্ব বরণ করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। কৃত্রিম অস্থিসন্ধি লাগিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব।’

সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবু জাফর চৌধুরী বীরু বলেন, ‘বাংলাদেশে তিন থেকে চারটি কোম্পানি এই ইমপ্ল্যান্ট বিক্রি করে। তার মধ্যে জনসন অ্যান্ড জনসন এবং স্মিথ অ্যান্ড নেফিউ কোয়ালিটি প্রোডাক্ট দেয়। ভারতীয় কোম্পানিও এই প্রোডাক্ট দেয় তবে তার কোয়ালিটি ভালো হয় না। রোগীরা সরাসরি কোম্পানির কাছে গিয়ে এই প্রোডাক্ট নেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এগুলোর দাম সাইজ ও কোয়ালিটির ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে ভালোটির মূল্য ৪ লাখ টাকা। এর নিচে ৩ লাখ, ২ লাখ ৮০  হাজার, ১ লাখ ৪০ হাজার, ১ লাখ ৫০ হাজার করে দাম পড়ে। সাধারণত ১ লাখ ৫০-৬০ হাজার টাকার মধ্যে যেটা পাওয়া যায় সেটা বেশি রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। কোনও প্রোডাক্টের ১৫-২০ বছর মেয়াদ থাকে। কোনও কোনোটির ৪০ বছর পর্যন্ত মেয়াদ থাকে।’