বৃহস্পতিবার (৩ মে) জেসমিন আক্তারের কর্মস্থল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে এই সুইসাইড নোটটি উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, ‘আমি বেঁচে থাকার কোনও রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার সবদিক থেকে অন্ধকার নেমে আসছিল। তাই এই পথটা বেছে নিলাম। আমার মৃত্যুর জন্য নির্মম দুর্ভাগ্যই দায়ী।’
গত ৩০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টার দিকে মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজসংলগ্ন পাইকপাড়া ‘সি’ টাইপ সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪ নম্বর ভবনের চারতলার বাম পাশের একটি ফ্ল্যাট থেকে জেসমিন আক্তার (৩৫), তার মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৯) এবং আদিলা তাহসিন হানির (৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।
ওইদিন দুপুর আড়াইটার মধ্যে অফিস থেকে বাসায় ফিরে ফুটফুটে দুই মেয়েকে খাটে বসিয়ে নিজ হাতে ভাত খাওয়ান জেসমিন। এরপর দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে শুয়ে পড়েন।
দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেলিমুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ঘটনায় জেসমিনের কর্মস্থলে তার ব্যবহৃত টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি নোট পাওয়া গেছে। সেখানে লেখা ছিল–আমার মৃত্যুর জন্য নির্মম দুর্ভাগ্যই দায়ী। প্রাথমিকভাবে কর্মস্থলে থাকা তার সহকর্মীরা নোটটি দেখে জানিয়েছেন, এটি তার লেখা। তারপরও এটি পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও মামলা হয়নি। তবে এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। এই ঘটনায় এখনও হত্যাকাণ্ডের কোনও ক্লু খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
পুলিশ জানায়, দুই মেয়েকে হত্যার পর মা জেসমিন নিজে আত্মহত্যা করেছেন কিনা, সেটি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। তবে সুইসাইড নোট পাওয়ার পর এই ধারণাটি অনেকাংশে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর আগে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সেলিম রেজা জানান, নিহত তিনজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের জখম পাওয়া গেছে। মৃত্যুর আগে তাদের কোনোকিছু খাওয়ানো হয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত করতে তিনটি মরদেহের ভিসেরা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে তিনটি মরদেহের শরীরে আঘাতের চিহ্নগুলো একটু ব্যাতিক্রমধর্মী।
মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশের বাম দিকের প্রথম রুমের মেঝেতে জেসমিন আক্তারের এবং খাটের ওপর দুই মেয়ে হিমি ও হানির রক্তাক্ত লাশ পড়ে ছিল। জেসমিনের গলা ও দুই হাতের কব্জি কাটা এবং পেটে ৮-১০টি ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। বড় মেয়ে হিমির বুকে তিনটি ছুরির আঘাত, হাতের কব্জি ও গলা কাটা। আর ছোট মেয়ে হানির পেটে একটাই ছুরির আঘাত। তার নাড়িভুঁড়ি বের হওয়া ছিল।
নিহত জেসমিনের ছোট ভাই শাহিনুর ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার বোন যে এতকিছু করতে পারে–এটা আমার ধারণায় ছিল না। দুই ঘণ্টায় একটা রুমের ভেতরে দরজা বন্ধ করে দুটি বাচ্চাকে ছুরি দিয়ে হত্যা করল অথচ কেউ কিছু জানতে পারল না!’
তিনি আরও বলেন, ‘যতটুকু জানতাম, আপার মনে অনেক কষ্ট ছিল, মানসিক প্রেশারও ছিল। তিনি তার চাকরি ও সন্তান লালন-পালন নিয়ে খুব টেনশন করতেন। বলতেন, চাকরি করলে বাচ্চাদের দেখবে কে; বাচ্চাদের দেখতে হলে চাকরি ছাড়তে হবে। আবার বলতেন, এসময়ে সহজে সরকারি চাকরি পাওয়া যায় না। তাই কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। দুলাভাই বলতেন, তুমি চাকরি ছেড়ে দাও, কিন্তু আপা এসব নিয়ে টেনশন করতেন। তখন আমি আপাকে বলতাম- আপনি চাকরি ছাড়বেন না, প্রয়োজনে আমি বাচ্চাদের দেখাশোনা করবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপার প্রচণ্ড মাইগ্রেনের সমস্যাও ছিল। এজন্য তার চিকিৎসাও চলছিল। তিনি যখন ঘুমাতেন তখন তাকে কেউ জাগাতো না। গত মাসে মাইগ্রেনের প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করতে না পেরে ৩৪টি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। এতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।’
জেসমিন আক্তার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কোষাধ্যক্ষ পদে কর্মরত ছিলেন। তার স্বামী হাসিবুল হাসান জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহকারী লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান হিসেবে কর্মরত। ২০০৮ সালে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। হাসিবুলের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের ভজনপুর গ্রামে এবং জেসমিনের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। তাদের বড় মেয়ে হিমি পাইকপাড়া এলাকার মডেল একাডেমি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো।