রাজিবের মৃত্যুতে মর্মাহত হাইকোর্ট, ক্ষতিপূরণের আদেশ মঙ্গলবার

রাজিবরাজধানীতে দুই বাসের চাপায় হাত হারানো তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার ঘটনায় মর্মাহত হয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এ ঘটনার পর রাজিবের দুই ভাইকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়ার জন্য  মঙ্গলবার (৮ মে) আদেশের দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। পাশাপাশি আদেশের সময় রাজিবের খালা জাহানারা পারভীনকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন হাইকোর্ট।

সোমবার (৭ মে) বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশের এদিন নির্ধারণ করেন।

আদালতে রাজিবের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।

শুনানিতে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে বলেন, ‘রাজিবের মামার কাছে শুনেছি, তাদের কোনও সহায়-সম্পত্তি নাই। শুধু একটু জায়গা আছে, তবে ঘর নাই। ১২ ও ১৮ বছরের দুই ভাই আছে। কিন্তু বাবা-মা নেই।রাজিবই তাদের দেখাশুনা করতো।’

তখন আদালত বলেন, ‘রুল শুনানিতো হবে। তবে এখন কিভাবে অন্তর্বর্তীকালীন তার পরিবারকে প্রতিকার দেওয়া যায়?’

জবাবে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘রুল জারির পর বিআরটিসি’র আইনজীবী মনিরুজ্জামান আমার সঙ্গে দেখা করে বলেছেন, বিআরটিসি চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা দিয়েছে। এছাড়া, স্বজন পরিবহনের একজন পরিচালকও আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। তারাও ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। বিষয়টি রাজিবের খালা আমাকে ফোনেও জানিয়েছেন। আর চিকিৎসা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যালে। সেখানে তো খরচ দিয়েছে সরকার।’

এসময় আদালত বলেন, ‘রাজিবের মৃত্যুতে পরিবারের যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে আমরা মর্মাহত। টাকা দিয়ে তো জীবনের মূল্য হয় না। যদি কোটি টাকাও ক্ষতিপূরণ দিতে বলি, তাতে তো আর জীবন ফিরে পাবে না। এরপরেও তার পরিবারের বিষয়টি দেখতে হবে।’

তখন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘এই ঘটনায় আইনের মধ্য দিয়ে বিচার হতে হবে।’ জবাবে আদালত বলেন, ‘মিশুক মুনীরের মামলাটা দেখতে পারেন।’

এ সময় রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘পাইপে পড়ে নিহতের ঘটনায় শিশু জিহাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।’

তখন আদালত বলেন, ‘সেটা তো ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্টদের বলেছেন। এখন দেখতে হবে, যদি কেউ ইনটেনশনালি মার্ডার করে, তখনতো ৩০২-তে মামলা আসা অমূলক নয়?’

রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আইন কমিশনের চেয়ারম্যান প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ট্রাফিক আইনের সংশোধন চেয়েছেন। তার মানে এ ঘটনা সবাইকে স্পর্শ করেছে।’

আদালত বলেন, ‘রাজিবের দুই ভাইয়ের বয়স কত?’ জবাবে রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘একজনের ১৪ ও অন্যজনের ১২ বছর।’

তখন আদালত বলেন,  ‘আমরা দুই ভাইয়ের জন্য ক্ষতিপূরণের আদেশ দেবো। কিন্তু গার্ডিয়ান কে? কার অনুকূলে দেবো?’

রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘তাদের মামা ও খালা আছেন।’ আদালত বলেন, ‘খালাকে আগামীকাল (মঙ্গলবার) নিয়ে আসেন এবং একটি আবেদন দেন, কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়।’

পরে রিটকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত রাজিবের দুই ভাইকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে আগামীকাল (মঙ্গলবার) আদেশ দেবেন। কিন্তু এই দুই ভাই অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় অর্থ গ্রহণের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করতে আদালত রাজিবের খালা জাহানারা বেগমকে আদালত আসতে বলেছেন। সঙ্গে যেন তার দুই ভাইকেও নিয়ে আসে। আদালত হয়তো রাজিবের দুই ভাইয়ের জন্য একটি ফিক্সড ডিপোজিট করারও নির্দেশ দেবেন।’

প্রসঙ্গত,  গত ৩ এপ্রিল দুই বাসচালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর শিকার হন তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসান। ওই ঘটনায় দুই বাসের চাপে হাত কাটা পড়ে তার। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর গত ৪ এপ্রিল রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।

হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার পাশাপাশি রুল জারি করেন। এমনকি রাজিবের চিকিৎসার খরচ স্বজন পরিবহন মালিক এবং বিআরটিসিকে বহনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এছাড়া, তাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এককোটি টাকা দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইন সংশোধন বা নতুন করে বিধিমালা প্রণয়নের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। সে রুলটি বর্তমানে বিচারাধীন।

তবে রুলটি বিচারাধীন থাকাবস্থাতেই গত ১৬ এপ্রিল সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে রাজিব মারা যান। সে বিষয়টি আদালতকে গত ৬ মে অবহিত করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।