অন্যদিকে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত ঘোষণার আগে গত ২ মে (বুধবার) বিএনপি দলীয় প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন বিএফইউজে বিএনপিপন্থী অংশের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি (ডিইউজে) কাদের গণি চৌধুরী, বিএফইউজের মহাসচিব এম. আব্দুল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্মসম্পাদক ইলিয়াস খান, ডিইউজে বিএনপিপন্থী অংশের সহ-সভাপতি শাহীন হাসনাত ও দফতর সম্পাদক শাহজাহান সাজুসহ অনেকেই।
এদিকে, কেসিসি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় সাংবাদিক নেতারা অংশ নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলামস মঞ্জু। তিনি এরই মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৮ মে) প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পাঠানো ১৬ দফা সম্বলিত অভিযোগপত্রের ৮ নম্বরে নজরুল ইসলাম মঞ্জু উল্লেখ করেছেন, ‘সচেতন সাংবাদিক সমাজ’ নামে সাংবাদিকদের নতুনভাবে গড়ে ওঠা একটি সংগঠনের ব্যানারে যেসব সাংবাদিক সরকার দলের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেকের পক্ষে ব্যাপকভাবে নির্বাচনি কার্যকলাপে অংশ নিয়েছেন, তাদের কোনোক্রমেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক, বা অন্য কোনও দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। শুধুমাত্র দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের নির্বাচনি পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দিতে হবে।’
প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এস এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘খুলনা সিটির মানুষ গত পাঁচ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। যানজটমুক্ত, নিরাপদ, দৃষ্টিনন্দন, আধুনিক ও পরিকল্পিত মহানগরী গড়াসহ খুলনার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই ‘সচেতন সাংবাদিক সমাজ’ নৌকার পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণায় নেমেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএফইউজে’র (বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন) সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল গত ৭ মে খুলনায় আসেন। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকার পক্ষে সচেতন সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রচারণা চালান।’ তিনি খুলনা মহানগরীর উন্নয়নের স্বার্থে তালুকদার আব্দুল খালেকের মতো একজন সৎ, কর্মঠ, নির্লোভ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে সমর্থন দেওয়ায় সচেতন সাংবাদিক সমাজকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে খুলনার সামগ্রিক উন্নয়নে নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান এস এম জাহিদ।
৭ মে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অফিস, ব্যাংক ও বীমা এলাকায় নৌকা প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগে অংশ নিয়ে মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে, স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গী করে বিএনপি দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়র নির্বাচিত হলে খুলনা মহানগরী আধুনিক শহরে পরিণত হবে।’
এ বিষয়ে জানতে মনজুরুল আহসান বুলবুলকে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বিএফইউজে’র (বিএনপিপন্থী) আরেক অংশের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ দেশের বাইরে থাকায় তারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বিএনপির নির্বাচনি মিডিয়া উপ-কমিটির সদস্য সচিব ও বন্ধ হওয়া ‘আমার দেশ’ পত্রিকার খুলনা প্রতিনিধি এহতেশামুল হক শাওন বলেন, ‘বিএনপির পক্ষে সাংবাদিকরা প্রচারে নামলে চাকরি যাওয়ার আতঙ্ক রয়েছে। তাই, সাংবাদিকরা নিরবতা পালন করছেন। এছাড়া, বিএনপি’র পক্ষ থেকে তাদের প্রচারে নামার জন্য আহ্বান জানানো হয়নি। বিএনপি চায় সাংবাদিকরা দল নিরপেক্ষ থেকে সঠিক তথ্য জনসম্মুখে তুলে ধরুক। সাংবাদিকরা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তারা যদি দলের পক্ষে অবস্থান নেন তাহলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়া ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএনপিপন্থী) সভাপতি কাদের গণি চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যদি কোনও সাংবাদিক অফিসিয়াল কোনও অ্যাসাইনমেন্টে যান, তখন নির্বাচনি কোনও প্রচারণায় তার অংশ নেওয়া উচিৎ নয়।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘খুলনা সিটি নির্বাচনে বিএফইউজে’র সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল অংশ নিয়েছেন ঠিক। কিন্তু সেখানে তিনি সাংবাদিক হিসেবে যাননি। আমি এটাকে দোষের কিছু মনে করি না। তবে দেখতে হবে কোনও সংবাদিক তার লেখনিতে কোনও পক্ষপাত করছেন কিনা।’
প্রচারণায় অংশগ্রহণকারীরা তো সাংবাদিক ব্যানারেই অংশ নিয়েছেন, এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতার ব্যানারে কিংবা সাংবাদিকদের এসব প্রচারণা থেকে যত দূরে থাকা যায়, ততই ভালো। কারণ, সাংবাদিকরা মানুষের একটা আস্থার স্থান।’
এ বিষয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক ইলিয়াস খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পেশার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিজস্ব একটা সাপোর্ট থাকে। সে অনুযায়ী যে কেউ যে কারও পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন।’
কেসিসি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মঞ্জু দাবি করেন, ‘আওয়ামী লীগ সাংবাদিকদের চাপ দিয়ে নৌকার পক্ষে মাঠে নামতে বাধ্য করেছে। সাংবাদিকরা উন্নয়নের পক্ষে। বিগত দিনে বিএনপিও খুলনার উন্নয়ন করে দেখিয়েছে। এবারই প্রথম চাপে পড়ে সাংবাদিকরা প্রচারে নামতে বাধ্য হয়েছেন। শুধুমাত্র দল নিরপেক্ষ সাংবাদিকরা সঠিক অবস্থানে রয়েছেন। বিএনপি নির্বাচনে সাংবাদিকদের ব্যবহারের পক্ষে নয়, তাই ধানের শীষের পক্ষে সাংবাদিকরা প্রচারে নামেননি।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি বিচার দেবো আল্লাহ’র কাছে। বিচার দেবো জনগণের কাছে, বিচার দেবো খুলনার ভোটারদের কাছে। আমাকে এই নির্বাচন থেকে সরানোর জন্য সরকার চূড়ান্তভাবে আক্রমণ করেছে। এত আক্রমণের মধ্যেও যেন ভোটারা আমার পাশে থাকেন। আমি বিশ্বাস করি, তারা আমাকে ভালোবাসেন।’
আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘সাংবাদিকসমাজ বরাবরই নিরপেক্ষ। খুলনায় এর ব্যতিক্রম কখনও হয়নি। সাংবাদিকদের চাপ দিয়ে কিছু করা যায় বলে আমি বিশ্বাস করি না। খুলনার সাংবাদিকরা সিটির উন্নয়নের দাবিতে সংঘবদ্ধ হয়েছেন। তারা সিটি করপোরেশন এলাকায় উন্নয়নের গতি দেখতে চান, তাই গণসংযোগ করে নৌকার পক্ষে ভোট চাইছেন।’