‘আমি গাঁজা ছাড়া অন্য কিছু বেচি না’ (ভিডিও)

ক্রেতাদের ডাকছেন মাদক বিক্রেতা

‘লাগবো? খাইবেন? সিদ্ধি (গাঁজা) খাওয়া ভালো, কাকা। ভালো মানুষে সিদ্ধি খায়। গাঁজা খাইবেন, আনন্দ পাবেন, কথায় কথায় খালি হাসবেন।’

এভাবে অনেকটা সুর করে ক্রেতাদের ডেকে চলেছেন এক মাদক বিক্রেতা। রেললাইনের বস্তির ঘরের সামনে কাগজের ডালাভর্তি গাঁজা হাতে নিয়ে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করছেন তিনি। ক্রেতারাও তার কাছে যাচ্ছেন। এরপর গাঁজা কিনে দ্রুত সরে পড়ছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের একদিন পর রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকার রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে গিয়ে দেখা যায় এভাবে প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য বিক্রি চলছে।

দূর থেকে মনে হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনও পণ্য বিক্রি চলছে। তবে কাছে ভিড়লে টের পাওয়া যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়, বিক্রি হচ্ছে মূলত মাদকদ্রব্য।

সোমবার (২৮ মে) দুপুরে ওই এলাকায় গেলে মাদকদ্রব্য বেচাকেনার এ দৃশ্য চোখে পড়ে। একটি ঘরের সামনে কাগজের ডালাভর্তি গাঁজা হাতে নিয়ে হেঁটে হেঁটে মাদকসেবীদের ডাকছিলেন ওই বিক্রেতা।

কাগজের ডালায় মাদকদ্রব্য

শুধু গাঁজা বিক্রি করেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই বিক্রেতা বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি সিদ্ধি (গাঁজা) ছাড়া অন্য কিছু বেচি না।’

খানিকক্ষণ সময় নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাবা (ইয়াবা) বেচা তো ভালো না। যারা বাবা-টাবা (ইয়াবা) বেচে তাদের পুলিশ ধরেই। বাবা খেলে মাথা নষ্ট হয়ে যায়, পরিবার নষ্ট হয়। যারা বাবা খায়, তারা নিজের বাপেরেই গালি দেয়।’

মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথোপকথনের মাঝে তিন মাদকসেবী এসে উপস্থিত হন। এরমধ্যে একজন মাদক ব্যবসায়ীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বাসি বানানো তামুক আছে, দুইটা দাও।’ মাদক বিক্রেতা তখন প্রশ্ন করেন, ‘কত ট্যাকার, একশ’ ট্যাকার?’ সম্মতিসূচক জবাব আসলে মাদকসেবীর হাতে গাঁজা পুরে দেন বিক্রেতা। চোখে-মুখে অসন্তুষ্টি ফুটিয়ে মাদকসেবী তখন বলেন, ‘একশ ট্যাকায় এটুক দিলা।’ সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতার হাতে বিক্রেতা আরও একটু গাঁজা তুলে দেন।

এই ফাঁকে গাঁজা বিক্রেতার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার নাম স্পেশাল রনি। অনেকেই আমারে চেনে-জানে। আমার কাছে ভালো সিদ্ধি আছে। ৫০-৩০ ট্যাকার গাঁজা খাইলে কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু ইয়াবা খাইলে সংসার নষ্ট, মাথা নষ্ট।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের প্রসঙ্গ তুলতেই ওই গাঁজা বিক্রেতা বলেন, ‘পুলিশ তো গতকাল অনেকরেই ধইরা নিয়া গেছে। আমি আছিলাম না; পলাইয়া ছিলাম। কিন্তু যাগো নিছে, তাগোর কেউ মূল ব্যবসায়ী না। ভালোগুলারে নিয়ে গেছে।’

এ সময় ‘স্পেশাল রনি’র পাশে এসে দাঁড়ান অন্য একজন, তার হাতেও কাগজের ডালায় সাজানো মাদকদ্রব্য। ওই বিক্রেতা স্পেশাল রনিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বালুর মাঠে ৫০ জনের মতো পুলিশ আছে, সইরা যা।’

এক ক্রেতাকে মাদকদ্রব্য দিচ্ছেন বিক্রেতা

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, কেবল ‘স্পেশাল রনিই নয়, তার মতো এমন আরও অনেকেই কাওরান বাজারে এভাবেই প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য বিক্রি করেন। স্থানীয় কয়েকজন দোকানদার জানান, চলমান অভিযানের মধ্যেই এভাবে প্রতিদিনই প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হচ্ছে। সোর্সের মাধ্যমে পুলিশ আসার খবর পেলেই সটকে পড়ে বিক্রেতারা।

স্থানীয় সবজি বিক্রেতা আবু সাইদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকাল পুলিশ অভিযান করে অনেককে নিয়ে গেছে। তাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। কয়েকজনকে আবার ছেড়েও দিছে। তবে যাদের ধরছে, তারা কেউই বড় কোনও মাদক ব্যবসায়ী না। তারা মাদকসেবী এবং খুচরা মাদক বিক্রেতা।’

সালেহা খাতুন নামে ওই বস্তির এক নারীর অভিযোগ, ‘পুলিশ বড় মাদক ব্যবসায়ীগো ধরে না। তারা তো সবই জানে, কে গাঁজা বেচে, কে ইয়াবা বেচে। কিন্তু যখন অভিযান চালায় তখন তো তারা কেউ (বড় মাদক ব্যবসায়ী) এখানে থাকে না। অভিযানের সময় পুলিশ সোর্সরা ওই ব্যবসায়ীদের আগেই খবর দেয়, তারা সরে যায়।’

এ ব্যাপারে ডিএমপির তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এদের ধরে ধরে মামলা দিচ্ছি, কারাগারেও পাঠানো হচ্ছে। তা-ও তারা ভালো হচ্ছে না। আমরা সাঁড়াশি অভিযান করবো। মাদক ব্যবসায়ীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

বড় মাদক ব্যবসায়ীরা ধরা পড়ছে না, বস্তিবাসীর এ অভিযোগের ব্যাপারে ওসি বলেন, ‘কাওরান বাজারের বস্তিতে ছয়জন মাদক সম্রাট ছিল। এরমধ্যে চারজনকে আমি গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছি। বাকিরা এই এলাকায় আর আসে না। যদি তাদের এই এলাকায় দেখা যায়, তবে তাদেরও গ্রেফতার করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আটক অনেক মাদক ব্যবসায়ী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ও গাজীপুর থেকে মাদকদ্রব্য আনে। আমরা মাদকের এই উৎসগুলো বন্ধের চেষ্টা করছি।’

উল্লেখ্য, রবিবার দুপুরে কাওরান বাজার রেললাইন বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। এ সময় মাদক বিক্রি ও মাদক সেবনের অভিযোগে ৪৭ জনকে আটক করা হয়। এরমধ্যে চার নারীও ছিলেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও থানা, তেঁজগাও শিল্পাঞ্চল থানা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল ওই অভিযান চালায়।