পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে পরিবহন চালক ও মালিকদের অসম প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ, মালিকের ভাড়া পরিশোধের পর যা থাকে তা-ই পান চালক। তাই রাস্তায় কার আগে কে যাবেন, কে বেশি যাত্রী তুলবেন— এমন প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রাজধানীর পরিবহন চালকরা। তীব্র যানজট থাকার পরও এ প্রতিযোগিতা দেখা যায় বিভিন্ন রুটে একই প্রতিষ্ঠান কিংবা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবহনের মধ্যে। এর ফলে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ।
ঢাকার একাধিক গাড়ি চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় তিন ধরনের পদ্ধতিতে গণপরিবহন পরিচালিত হচ্ছে— দৈনিক মজুরিভিত্তিক, মাসিক মজুরিভিত্তিক ও টার্গেট বা ভাড়াভিত্তিক চুক্তি। দৈনিক মজুরিভিত্তিতে পরিবহনের চালকরা কাজে যোগদানের পর দৈনিক নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা পান। মাসিক মজুরিভিত্তিতে চালকরা মাসে নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা এবং সপ্তাহে একদিন করে ছুটি পান। এ ছাড়া কিছু সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে তাদের। আর টার্গেট বা ভাড়াভিত্তিক চুক্তিতে পরিচালিত পরিবহনের চালকরা মালিকের নির্ধারিত দৈনিক ভাড়া পরিশোধ করে অতিরিক্ত যে টাকা থাকে তা দিয়েই তাদের সংসার চালান।
এ অবস্থায় ব্যাপক সমালোচনা মুখে পড়েছে দেশের পরিবহন খাত। মালিক ও চালকদের একছত্র আধিপত্যের ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে মনে করে রাজধানীতে সুশৃঙ্খল গাড়ি চালানো ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চুক্তি বা টার্গেট ভিত্তিক পরিবহন না চালানোসহ বেশি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। কিন্তু সমিতির সিদ্ধান্ত পাত্তা দিচ্ছে না মালিক ও চালকরা।
সূত্র জানায়, রাজধানীতে সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি পরিচালনা ও সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মালিক-শ্রমিকদের যৌথসভা হয় গত ১২ এপ্রিল। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউটে হওয়া ওই সভায় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ২৬ এপ্রিল সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আরও একটি সভা হয়। সেই সভায়ও আগের সিদ্ধান্তসহ আরও কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্তগুলো হলো পরিবহন কোম্পানি বা মালিক সমিতির কোনও গাড়ি চুক্তিভিত্তিক কিংবা টার্গেটে চালানো যাবে না। গাড়ি ওয়ে-বিল পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে হবে। অসম প্রতিযোগিতা করে বেপরোয়াভাবে কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না। নেশাগ্রস্ত কিংবা লাইসেন্সবিহীন চালককে দিয়ে গাড়ি চালানো যাবে না। তাদের কোনও পরিবহনের গাড়িতে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২ মাস পর পর সচেতনতামূলক সভার ব্যবস্থা করতে হবে। চালকদের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা মালিকের কাছে সংরক্ষণ থাকতে হবে। আগামী ১ মাসের মধ্যে রঙচটা, রঙবিহীন ও জরাজীর্ণ গাড়িগুলো মেরামত করে দৃষ্টিনন্দন করে চালাতে হবে।
এসব সিদ্ধান্ত যদি কোনও পরিবহন কোম্পানি বা মালিক যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করে তাহলে সংশ্লিষ্ট সমিতি/কোম্পানির সনদ বাতিল করার জন্য সুপারিশ করা হবে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহর সই করা চিঠিতে এসব সিদ্ধান্ত ঢাকা শহর ও শহরতলী রুটে চলাচলকারী সব পরিবহন কোম্পানির কাছে পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, সিদ্ধান্তগুলো জরুরিভিত্তিতে পালন ও বাস্তবায়নের জন্য অনুরোধ করা হলো। এ ব্যাপারে কোনও পরিবহনের বিরুদ্ধে অনিয়মের কোনও অভিযোগ পাওয়া গেলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে এবং নিয়ম না মানা পরিবহন কোম্পানি/সমিতি সরাসরি কেন্দ্রীয় ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রণ করবে।
সমিতির সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পরিবহন চালক বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যারা বৈঠক করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারাই তা মানছেন না। আর তারা তো চালক মাত্র। মালিকদের কেউই তাদের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানাননি। মালিকরা যদি চুক্তিভিত্তিক গাড়ি ভাড়া না দেন তাহলে তো তাদের আর টার্গেটভিত্তিতে গাড়ি চালানোর প্রয়োজন হয় না।
যাত্রাবাড়ী টু গাবতলী রুটের ৮ নম্বর লোকাল বাসের এক চালক আরিফ বলেন, ‘এমন একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে শুনেছি। কিন্তু মালিকরা তো আমাদের দৈনিকভিত্তিতে ভাড়া ছাড়া বাস দিচ্ছে না। তখন আমাদের আর কী করার থাকে? আমরা তো টার্গেটভিত্তিতে বাস চালাতে বাধ্য। কারণ মালিকের ভাড়ার টাকা ওঠার পর যে টাকা আসবে সেগুলো আমাদের আয়।’
জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজধানীতে চুক্তি বা টার্গেটভিত্তিক কোনও পরিবহন চালানো যাবে না। এ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো জানিয়ে আমরা সব মালিককে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে কিছুটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে। পরিবর্তন আসবেই।’