সিটিটিসি’র প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বৈধ ব্যবসার আড়ালে অনেকেই অবৈধভাবে অস্ত্র কেনাবেচা করছে। আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা নজরদারি এবং গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছি। ইতোমধ্যে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের দেওয়া তথ্য মতো অন্যদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।’
সিটির কর্মকর্তারা জানান, বৈধ অস্ত্র ব্যবসার আড়ালে অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের মধ্যে অস্ত্র বেচাকেনা করছে। কিন্তু এসব অস্ত্র কেনাবেচার ক্ষেত্রে তারা রেজিস্টার মেইনটেন করছে না। কয়েক হাত বদল হওয়ার পর এসব অস্ত্র বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে সরাসরি সন্ত্রাসীদের হাতে। প্রতিটি অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে দিগুণেরও বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে।
সিটিটিসি সূত্র জানায়, সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা বৈধ অস্ত্র ব্যবসার আড়ালে অবৈধ ব্যবসার এই চক্রের সন্ধান পায় এ বছরের এপ্রিলে। পহেলা এপ্রিল রংপুরের সরকার আর্মস কোম্পানির মালিক আনোয়ার হোসেন বাবু অবৈধভাবে দুটি অস্ত্র বিক্রি করতে ঢাকার গাবতলীতে আসলে সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ এক সহযোগীসহ তাকে গ্রেফতার করে। সেসময় বাবু জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, রাজশাহীর এক বৈধ আর্মস ডিলারের ও রংপুরের এক নারীর কাছ থেকে অস্ত্র দুটি সংগ্রহ করেছিল সে। পরে সেগুলো অবৈধভাবে বিক্রির চেষ্টা করছিল।
সিটিটিসি সূত্র আরও জানায়, ডা. জাহিদুল ও তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অস্ত্রের উৎস সন্ধান করতে গিয়ে ময়মনসিংহের অস্ত্র ব্যবসায়ী ওস্তাদ এ কে এম শাহাবুদ্দিন খাঁকে শনাক্ত করা হয়। খাঁন আর্মস স্টোর নামে বৈধ অস্ত্র ব্যবসার আড়ালে তিনি অবৈধ অস্ত্রের বেচাকেনাও করতেন। শাহাবুদ্দিনসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১১ জুন মহাখালী এলাকা থেকে মোহাম্মদ আলী বাবুল ওরফে বাবুল মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে সেসময় দুটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১২৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে তার বাসায় অবৈধ অস্ত্রের মজুদ রয়েছে বলে জানায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (১৪ জুন) ময়মনসিংহের চুরখাই এলাকায় বাবুলের বাসা থেকে আরও ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও এক হাজার ১৮৫ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
যেভাবে অবৈধ হচ্ছে বৈধ অস্ত্র
সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক মাসে যেসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তা বৈধ অস্ত্র হিসেবেই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রবহনকারী ব্যক্তি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন নিয়ে বৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছে তা বিক্রি করে দেয়। সেই ব্যবসায়ী তার স্টক রেজিস্টারে তা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করে না। ওই বৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী এসব অস্ত্র কাগজপত্র ছাড়াই আরেক জেলার আর্মস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেয়। এসব অস্ত্র রেজিস্টারে লিপিবিদ্ধ না করে কয়েক হাত বদল হওয়ার পর সরাসরি তা সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অস্ত্রের দাম হয়ে যায় প্রায় দিগুণ।সূত্র জানায়, অনেকের বাড়িতে পৈত্রিকভাবে থাকা একনালা বা দোনালা বন্দুকগুলো বিক্রির জন্য কোনও ডিলারের কাছে নিয়ে গেলে নামমাত্র মূল্যে তা কিনে নেয় ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নেওয়া হলেও পরবর্তীতে হাত বদলের ক্ষেত্রে আর কোনও অনুমতি নেওয়া হয় না।
সর্বশেষ গ্রেফতার হওয়া মোহাম্মদ আলী বাবুলের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, বাবুলের বৈধ যে অস্ত্রের দোকান রয়েছে, সেখানে মাত্র একটি বন্দুক ছিল। কোনও গুলি নেই। অবৈধভাবে সংগ্রহ করা অস্ত্রগুলো সে নিজের বাসায় রেখেছিল। অথচ দোকান থেকে কোনও অস্ত্র বাসায় নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই। দোকানের কোনও অস্ত্র নিজের সঙ্গে কোথাও নিয়ে গেলেও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি লাগে। বাবুল জানিয়েছে,মাসে মাসে ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর যে প্রতিবেদন দেওয়ার নিয়ম রয়েছে, সে তা বছরে মাত্র একবার দিতো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বাইরে বৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নিয়মিত মনিটরিং করা হয় না। এছাড়া, অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বেচাকেনার নথিপত্র ম্যানুয়ালি সংরক্ষণ করা থাকে। যার ফলে কোনও একটি অস্ত্র ধরার পর তার প্রকৃত মালিক এবং অস্ত্রটি কয় হাত বদল হয়েছে, তা জানা কঠিন হয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটালভাবে সব বৈধ অস্ত্রের তালিকা ও তথ্য হালনাগাদ করা হলে বৈধ অস্ত্রগুলো কখন কার হাতে থাকছে, তা জানা সহজ হবে।