৫ দিন বাবা ও ২ দিন মায়ের কাছে থাকবে চট্টগ্রামের সেই দুই শিশু

সুপ্রিম কোর্টচট্টগ্রামের মাইনুল ইসলাম চৌধুরী ও রুমানা ফয়েজের দুই শিশু সন্তানকে রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাবার কাছে আর সপ্তাহের বাকি দুদিন মায়ের কাছে রাখার নির্দেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার (১৪ আগষ্ট) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বাবা ও মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানদের নিজ হেফাজতে নিতে করা মামলায় এ আদেশ দেওয়া হয়।
আদালতে শিশুর বাবার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সৈয়দ তাজরুল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। অন্যদিকে মায়ের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ফিদা এম কামাল ও এম এ হান্নান।

আদালত তার আদেশে বলেন, দুই শিশু সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাবার কাছে থাকবে। বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় বাবা দুই শিশুকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পৌঁছে দেবেন। সেখান থেকে উপ–পরিচালক শিশু দুটিকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেবেন। শনিবার দিন সন্ধ্যা ছয়টায় মায়ের কাছ থেকে শিশুদের ওই কর্মকর্তা নিজ কার্যালয়ে নিয়ে আসবেন। ওখান থেকে শিশুদের বাবা নিয়ে যাবেন। ওই কর্মকর্তা শিশুদের নিরাপত্তা ও হেফাজতের বিষয়টি তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করবেন এবং আদালতে প্রতিবেদন দেবেন।

আপিল আদালত আরও বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মেহজাবিন বিনতে গাফফার, যিনি সপ্তাহে একবার মায়ের বাসায় এবং বাবার বাসায় শিশুদের কাউন্সিলিং দেবেন। সঙ্গে থাকবেন সমাজসেবা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক। এরপর আদালত পরবর্তী আদেশের জন্য ৪ অক্টোবর দিন রেখে সেদিন দুই শিশু, তাদের বাবা–মা এবং উপ–পরিচালককে আদালতে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের ১২ মার্চ চট্টগ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মাইনুল ইসলাম চৌধুরী ও রুমানা ফয়েজের বিয়ে হয়। এরপর তাদের ঘরে দুই সন্তানের জন্ম হয়। পারিবারিক বিরোধের সূত্র ধরে গত বছরের ২১ নভেম্বর ওই দম্পত্তির বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদের পর দুই সন্তান তাদের বাবার কাছে ছিল।

সন্তানদের নিজ হেফজতে নিতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাইকোর্টে রিট করেন শিশুদের মা। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, দুই শিশু সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকবে। মাকে অবহিত করে বাবা একদিন পর পর শিশুদের গিয়ে দেখতে পারবেন। আরও বলা হয়, বাবা শুক্রবার শিশুদের নিয়ে যাবে ও শনিবার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেবেন।

পরে হাইকোর্টের সে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন শিশুদের বাবা ও মা। যার ওপর শুনানি নিয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি আদেশ দেন আপিল বিভাগ। এর আগে আদালত দুই শিশু এবং তাদের বাবা ও মায়ের বক্তব্য শোনেন। আদেশে বলা হয়, শিশুদের নিরাপত্তা ও হেফাজত তদারকির জন্য চট্টগ্রামের সমাজ সেবা বিভাগের একজন প্রবিশন কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন। দুই শিশু রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাবার হেফাজতে থাকবে। বৃহস্পতিবার বিকেলে পাঁচটায় প্রবিশন কর্মকর্তা দুই শিশুকে মায়ের কাছে নিয়ে যাবে এবং শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় বাবার কাছে ফিরিয়ে দেবেন।

কিন্তু সে আদেশ প্রতিপালন না হওয়ায় মা চলতি বছরের ১৪ মার্চ আদালত অবমাননার আবেদন করেন, যার ওপর শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ ২৯ মার্চ কারণ দর্শাতে আদেশ দেন। বাবা ও প্রবিশন কর্মকর্তার তরফ থেকে লিখিতভাবে জবাব দেওয়া হয়। এরপর শিশুদের স্বার্থ বিবেচনা করে গত ৯ জুলাই আপিল বিভাগ প্রবিশন কর্মকর্তা পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের সমাজ সেবা বিভাগের উপ–পরিচালকের নীচে নন এমন কর্মকর্তাকে শিশু দুটিকে তদারকির জন্য নিয়োজিত করার নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই ওই উপ–পরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরে আপিল বিভাগ দুই শিশু, তাদের বাবা–মা এবং দুই শিশুর সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রাম জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের উপ–পরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মঙ্গলবার (১৪ আগস্ট) আদালতে হাজির হতে বলেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় দুই শিশু, তাদের বাবা ও মা এবং মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম আজ আদালতে হাজির হন। পরে আদালত খাস কামরায় শিশুদের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা, শিশুদের মা ও দুই শিশুর বক্তব্য শোনেন এবং পরে আদেশ দেন।