উজ্জ্বল বালো। থাকেন রাজধানীর গ্রিন রোড এলাকায়। বাসায় কাজ করার সময় তার মা রেনু বালো হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। মায়ের এ অবস্থায় তিনি তাৎক্ষণিক চিকিৎসক ডাকার জন্য অনলাইনভিত্তিক অ্যাপসের নম্বরে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে সাড়াও মেলে দ্রুত। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাসায় চিকিৎসক এসে হাজির হন। তারপর সবকিছু পরীক্ষা করে চিকিৎসক নিশ্চিত হন—প্রেসার লো হয়ে যাওয়ায় রেনু বালোর এই সমস্যা হয়েছে। চিকিৎসক সামান্য কিছু ওষুধ লিখে দেন। তা খেয়েই সুস্থ হয়ে ওঠেন উজ্জ্বল বালোর মা রেনু বালো।
মায়ের দ্রুত চিকিৎসা করাতে পারায় বেশ সন্তুষ্ট উজ্জ্বল বালো। তিনি বলেন, ‘মায়ের যে অবস্থা হয়েছিল, ওই অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে, সিএনজি অটোরিকশা বা রিকশা ডাকতে ডাকতেই মা আরও অসুস্থ হয়ে যেতেন। ঢাকার রাস্তার জ্যাম তো বোঝেনই। আমি মনে করি, এই ধরনের অ্যাপভিত্তিক চিকিৎসার উদ্যোগ খুবই উপকারী।’
‘অ্যাপয়েন্টমি’ মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে প্রয়োজনে চিকিৎসক ও নার্স ডাকার সুযোগ রয়েছে। রাজধানীর উত্তরায় শুরু হওয়া এই অ্যাপভিত্তিক চিকিৎসা সেবার উদ্যোক্তা ফয়সাল আহমেদ। বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সারা ঢাকা শহরে পরীক্ষামূলকভাবে এই সার্ভিসটি চালু করেছি। আমাদের সঙ্গে প্রায় ৫০ জন চিকিৎসক যুক্ত আছেন। আর নার্স আছেন প্রায় ১০০ জন। আগামী অক্টোবর আমাদের এই মোবাইল অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবো।’
অ্যাপভিত্তিক চিকিৎসা সেবার খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকের ভিজিট এক হাজার থেকে ১২শ’ টাকা। নার্সকে পাঁচশ’ টাকা করে ভিজিট দিতে হয়। রোগীর বাসায় যদি ঘণ্টা হিসেবে নার্সকে থাকতে হয়, তাহলে তাকে প্রতি ঘণ্টায় একশ’ টাকা করে ভিজিট দিতে হয়। আর যদি নার্স কোনও হরমোনাল ইনজেকশন দেন বা আইসিইউ’র রোগী দেখেন, সেজন্য তাকে এক হাজার টাকা ভিজিট দিতে হয়। কারণ, এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নার্স লাগে।’
‘ডাক্তার ডাকো’ নামে অ্যাপ চিকিৎসা সেবার এক্সিকিউটিভ তাপস সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইলে বলেন, ‘আমরা এই আগস্ট মাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালু করেছি। খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসক দিতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসকরা কোনও রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে বা মারাত্মক সমস্যা দেখা দিলে, তার সমাধান করতে পারেন না। এক্ষেত্রে আমরা রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলি। আর সাধারণ চিকিৎসার জন্য আমরা চিকিৎসকদের রোগীর বাড়িতে পাঠাই। আমাদের চিকিৎসকদের আরেকটা বিশেষত্ব হচ্ছে—রোগীর কোনও ডায়াগনোসিস লাগলে, চিকিৎসক কোনও নির্দিষ্ট ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের নাম লেখেন না। রোগীকে তার সুবিধামতো ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করাতে বলেন।’
তাপস সরকার বলেন, ‘ আমাদের সিনিয়র চিকিৎসকের ভিজিট এক হাজার টাকা এবং জুনিয়র চিকিৎসকের ভিজিট ৬০০ টাকা করে নিয়ে থাকি। এরমধ্যে চিকিৎসকের যাতায়াত ভাড়া ও তার সহায়তাকারীর যাতায়াত ভাড়া উল্লেখ করা হয়।’
তিনি জানান, এই আগস্ট মাসে ধানমন্ডি, কলাবাগান, গ্রিন রোড এলাকায় ‘ডাক্তার ডাকো’ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে রাজধানীর সব জায়গায় সার্ভিস দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
এদিকে কোনও কোনও চিকিৎসক বলছেন, বাসায় গিয়ে চিকিৎসক রোগী দেখলে সবসময় সেটা রোগীর কাজে আসে এমনটি নয়। মারাত্মক রোগীর ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া দরকার। কারণ, বাসায় তার চিকিৎসা করার মতো উপকরণ থাকে না। আবার সাধারণ অসুখ যেমন—জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে রোগী নিজেই গিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন।
হেলথ রাইটস মুভমেন্ট ন্যাশনাল কমিটির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. রশীদ-ই-মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসক বাসায় গিয়ে কতগুলো প্রাইমারি হেলথ কেয়ার করতে পারেন। একসময় আমাদের দেশে বাড়ি গিয়ে রোগী দেখার রেওয়াজ ছিল। এখন তো বাড়িতে গিয়ে রোগী দেখা উঠেই গেছে। মূলত ব্যবসায়িক চিন্তা থেকেই এখন এই ধরনের অ্যাপ চালু হচ্ছে। ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে হলেও সমস্যা নেই, তবে রোগীর প্রয়োজনে চিকিৎসক বাড়িতে যাওয়া এবং তার খরচ রোগীর জন্য সহনীয় হলে, তবে সেটা সফল হতে পারে। এক্ষেত্রে গরিব রোগীরা খুব বেশি সুবিধা পাবেন না বলেই মনে হয়।’