রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধি ৩০৪(খ), ২৭৯ ও ৩৪ ধারায় অভিযুক্ত করে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে যাচ্ছে পুলিশ। এই দুই শিক্ষার্থী নিহতের জেরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে। এ পটভূমিতে দণ্ডবিধি ৩০২ ধারার পরিবর্তে ৩০৪(খ) ধারায় অভিযুক্ত করায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা মামলায় এ সপ্তাহেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এর আগে গত ৩০ জুলাই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিলের জন্য ৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করে দেন আদালত।
সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) ডিবি কার্যালয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন সাংবাদিকদের জানান, এ সপ্তাহে এই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। দণ্ডবিধি ৩০৪ ধারায় আসামি করা হচ্ছে ছয়জনকে।
দণ্ডবিধি সম্পর্কে একই তথ্য জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশ (পরিদর্শক) কাজী শরিফুল ইসলাম। বাংলা ট্রি্বিউনকে তিনি বলেন, ‘দুই শিক্ষার্থী নিহতের মামলায় আসামিদের দণ্ডবিধির ৩০৪(খ), ২৭৯ ও ৩৪ ধারায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে।’
দণ্ডবিধি ৩০৪(খ) ধারায় বলা আছে, ‘কোনও ব্যক্তি বেপরোয়া যান চালিয়ে বা অবহেলাজনকভাবে জনপথে যান চালিয়ে কারও মৃত্যু ঘটায়। এজন্য দায়ী চালককে তিন বছর পর্যন্ত যেকোনও মেয়াদের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।’
৩০২ ধারায় শাস্তি বিধানে বলা আছে, ‘কোনও ব্যক্তি যদি খুনের অপরাধ করে তবে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবে।’
মামলার চার্জশিটে আসামিদের ৩০৪(খ) ধারায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে শুনে বিস্মিত হন নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিমের বাবা ও মামলার বাদী জাহাঙ্গীর ফকির। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি তো শুনেছিলাম ফাঁসি হবে। কিন্তু ৩০৪ ধারায় হলে কীভাবে হবে? এটা তো হত্যাকাণ্ড। দুজনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালাচ্ছিল চালকরা। এই বিষয়টা দেশসহ সারাবিশ্বের সবাই জানে। তবে আদালতের ওপর আমাদের আস্তা আছে। বিশ্বাস করি, সুবিচার পাবো।’
৩০২ ধারার পরিবর্তে ৩০৪(খ) ধারায় আসামিদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে শুনে হতাশা প্রকাশ করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এটা শুনে একজন পেশাজীবী হিসেবে আশাহত হলাম। চালকদের গাফিলতির জন্য দুজন শিক্ষার্থী মারা গেছেন। পুলিশ প্রতিবেদনে এটার প্রতিফলন থাকা উচিত।’
দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর জড়িত সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের বিচার দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সম্ভব।’ গত ৬ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধরে নিয়ে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় বিচারের সুযোগ রয়েছে।’
এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় ওইদিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও একই কথা বলেছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, ‘সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি নতুন আইনে বিচারের সুযোগ নেই। বিদ্যমান আইনেই সেটা হবে। আর বিদ্যমান আইনে পেনাল কোডের ৩০২ ধারার অধীনে এ ঘটনার বিচারের সুযোগ রয়েছে।’
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, পুলিশ প্রতিবেদনই শেষ কথা নয়। তিনি বলেন, ‘মামলার সংশ্লিষ্টরা পুলিশ কী প্রতিবেদন দিচ্ছে তা দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবেন। পুলিশ যে প্রতিবেদন দেয়, সেটাই শেষ কথা নয়। এখানে দুটো বিষয় আইনগতভাবে আছে। যে আদালতে মামলাটির বিচার চলবে সেই আদালত চাইলে ফারদার ইনভেস্টিগেশনের জন্য দিতে পারেন। এই ইনভেস্টিগেশন কতবার হবে তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। পুলিশ না করে অন্য কোনও ল এনফোর্সেস এজেন্সি এটা তদন্ত করতে পারে। আর যে প্রতিবেদন আদালতে আসবে তা বিচারক মহোদয়কে হুবহু মেনে নিতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। তিনি সব কাগজ ও অভিযোগ দেখে যদি মনে করেন এটা ৩০৪(খ) হবে না, এটা ৩০২ হবে, তাহলে তিনি ৩০২ ধারাতেই অভিযোগ গঠনের জন্য নির্দেশ দিতে পারেন।’
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, চার্জশিটে অভিযুক্ত হতে যাচ্ছেন ছয়জন। তারা হলেন জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের চালক মাসুম বিল্লাহ ও জোবায়ের সুমন, দুই সহকারী এনায়েত হোসেন ও কাজী আসাদ এবং এ দুটি বাসের মালিক শাহাদাত হোসেন ও জাহাঙ্গীর আলম। এদের মধ্যে যে বাসটি চাপা দেয় সেটির চালক মাসুম বিল্লাহ, সহকারী এনায়েত হোসেন ও মালিক শাহাদাত হোসেন। আর বাকি তিনজন যে বাসটির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া হয়েছিল, সেটির চালক, সহকারী ও মালিক।
এই ছয়জনের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন চারজন। দুইজন এখনও পলাতক। তারা হলেন সহকারী কাজী আসাদ ও মালিক জাহাঙ্গীর আলম। পলাতকদের গ্রেফতার করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশ (পরিদর্শক) কাজী শরিফুল ইসলাম।
গত ২৯ জুলাই দুপুরে কালশী ফ্লাইওভার থেকে নামার মুখে এমইএস বাস স্ট্যান্ডে ১৫২০ জন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে ছিলেন। জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় মুখেই দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় পেছন থেকে জাবালে নূরের আরেকটি বাস ওভারটেক করে সামনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায়। এতে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আব্দুল করিম রাজু ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহত হন আরও ৮-১০ জন শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় নিহত মিমের বাবা জাহাঙ্গীর ফকির ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
আরও পড়ুন: মিম-রাজু নিহতের ঘটনায় অভিযুক্ত হচ্ছেন জাবালে নূরের মালিকসহ ৬ জন