দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ডে পরিণত হওয়া রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে রেলগেট পর্যন্ত সড়ক দখলমুক্ত করা হয়েছে। তবে মেয়র আনিসুল হকের নামে নামকরণ করা সড়কটির দুই-একটি স্থানে খালি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ফলে এ সড়কে কোনও যানজট দেখা যায়নি। এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। চালক ও মালিকরাও সড়কটি দখলমুক্ত রাখার কথা জানিয়েছেন।
সোমবার (৩ সেপ্টেম্বর) সড়কটিতে এমন চিত্র দেখা গেলেও এলাকার ভেতরের সড়কগুলোতে যথারীতি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক তেজগাঁও সড়কটি দখলমুক্ত করতে গিয়ে ট্রাক শ্রমিকদের ক্ষোভের মুখে পড়েন। তবে তিনি অনড় থাকায় সড়কটি দখলমুক্ত করা হয়। ২০১৭ সালে সাতরাস্তা থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কের উন্নয়ন করে সড়ক বিভাজকে লাগানো হয় গাছ। সড়কটি দখলমুক্ত হওয়ায় এর সুফলও পেতে শুরু করে নগরবাসী। মেয়রের জীবদ্দশায় সড়কটি দখলমুক্ত ছিল। তবে গত কয়েক মাসে সড়কটি আবার পুরানো চেহারায় ফিরে যায়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর মারা যান আনিসুল হক।
মেয়রের মৃত্যুর পর ঢাকা ডিএনসিসির শিথিলতার সুযোগ নিয়ে আবারও তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কগুলোর বড় অংশ দখল করে ট্রাক রাখতে শুরু করেন ট্রাক মালিক ও শ্রমিকরা।
গতকাল রবিবার (২ সেপ্টেম্বর) ডিএনসিসির প্যানেল মেয়র জামাল মোস্তফা সড়কটি পরিদর্শনে যান। এসময় তাকে ট্রাকস্ট্যান্ড ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, সড়কে কোনও ট্রাক রাখা হবে না। পরে প্যানেল মেয়র ঘোষণা দেন, আজ বুধবার থেকে সড়কটি দখল মুক্ত থাকবে।
এদিন সকাল ও বিকেলে দেখা গেছে, সড়কটি দখলমুক্ত হয়েছে। তবে দু-একটি স্থানে কয়েকটি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অবশ্য চালকরা জানিয়েছেন, ট্রাকগুলো স্ট্যান্ড থেকে বের হয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। হেলপারের জন্য অপেক্ষা করছে। এছাড়া ওই এলাকার ভেতরের প্রতিটি সড়কে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান ট্রাকপণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মকবুল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়র আনিসুল হক উচ্ছেদ করার পর থেকে আমরা তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি সড়কে কোনও ট্রাক থাকবে না। এরপর থেকে আমরা ওভাবে ট্রাক রাখিনি। তবে মাঝে-মধ্যে কোনও কোনও চালক রাখতেন। আমরা তাদের সতর্ক করেছি। গতকাল আবার যখন প্যানেল মেয়র এসে আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তখন তিনি এসেও কোনও ট্রাক পার্কিং অবস্থায় দেখেননি। এরপরও আমরা তাকে জানিয়েছি, আজ থেকে কোনও ট্রাক সড়কে থাকবে না।’
ট্রাক চালক রাজিব উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেক সময় আমরা অসতর্ক অবস্থায় ট্রাক রাখতাম। এখন আমরা অনেক সতর্ক হয়েছি। কাগজপত্র ছাড়াও কোনও ট্রাক চালাই না। রাস্তায়ও রাখি না। আমাদের কষ্ট হলেও আমরা ট্রাক ভেতরে রাখি। ভেতরে জায়গা না থাকলে দূরে গিয়ে হলেও এমন স্থানে রাখি যাতে মানুষের চলাচলের পথ রুদ্ধ না হয়। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি কোনও ট্রাক রাস্তায় পার্কিং করবো না।’
আরেক ট্রাক চালক তুহিন মিয়া বলেন, ‘প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্ন ধরে রাখার জন্য আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। পুরো সড়ক দখলমুক্ত দেখে আমাদের কাছেও ভালো লাগছে। আমরা নিজেরাই এখন এই সড়কটি দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব নিয়েছি। রাস্তা পাহারা দেওয়া জন্য এখন আর সিটি করপোরেশনের কেউ আসতে হবে না।’
তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের দাবি, সরকার যাতে আমাদের একটি ট্রাক স্ট্যান্ড তৈরি করে দেয়। আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে থাকি। তাহলে কেন সরকার আমাদেরকে ট্রাক রাখার জায়গা দেবে না?’
নাখালপাড়ার বাসিন্দা মুরশিদা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার অফিস তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। এই পথটি দিয়েই আমাকে প্রতিদিন চলাচল করতে হয়। সড়কটি দখলে থাকার কারণে একসময় রিকশা দিয়ে কাওরান বাজার- এফডিসি হয়ে আসতে হতো। এই রাস্তা দিয়ে হেঁটেও আসা কঠিন ছিল। চোর-ছিনতাইকারীদের ভয়ে কেউ আসতো না। কিন্তু এখন পুরো সড়ক দখলমুক্ত, আলোতে ঝকঝক করছে। এত সুন্দর সড়ক হবে আমরা কল্পনাও করিনি। এখন রিকশাও ব্যবহার করার দরকার হয় না। সুন্দর রাস্তা হেঁটে চলাচল করতে পারি।’