রাজধানীর প্রধান সড়কে বন্ধ হচ্ছে লেগুনা!

রাজধানীর প্রধান সড়কের বাইরের একটি সড়কে চলছে লেগুনাঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আসাদুজ্জামান মিয়ার ঘোষণা অনুযায়ী, রাজধানী থেকে লেগুনা বন্ধ হচ্ছে না। তবে প্রধান সড়কগুলো থেকে এ পরিবহনটি উঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে পুলিশ। জটিলতা এড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) অনুমোদিত রুট পারমিটেই তারা লেগুনা চালাচ্ছেন। শুধু একটি ঘোষণার মাধ্যমে কোনও অনুমোদিত বিষয় বন্ধ করে দেওয়া যায় না। আর বিআরটিএ বলছে, তারা বিষয়টি নিয়ে অবগত নয়।
গত মঙ্গলবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার রাজধানী থেকে সব ধরনের লেগুনা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার কারণ এই লেগুনা। তাই এখন থেকে আর কোনও লেগুনা চলবে না। এতদিন যেসব লেগুনা চলেছে, তার কোনও রুট পারমিট নেই। সব অবৈধভাবে চলছে।’তিনি আরও বলেন, ‘তবে শহরের উপকণ্ঠে লেগুনা চলতে পারবে। সেখানে লেগুনা চললে কোনও বাধা দেওয়া হবে না। যেমন, বসিলা ও ৩০০ ফিট এলাকার ওদিকে চলতে পারবে।’
ডিএমপি কমিশনারের এ ঘোষণার একদিন পর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই কমিটির সভাপতি ডিএমপি কমিশনার। তিনি প্রথম দিকে ওই বৈঠকে ছিলেন। পরে চলে গেলেও তার প্রতিনিধি হিসেবে একজন যুগ্মকমিশনার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পুলিশের পক্ষ থেকে লেগুনা মালিকদের প্রধান সড়কগুলোতে পরিবহন চলাচল বন্ধ করতে অনুরোধ করা হয়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো-রিকশা অটোটেম্পু পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ৫ সেপ্টেম্বর আরটিসি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আমাদের ছয়জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এতে পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে লেগুনা বা হিউম্যান হলার বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়। এ নিয়ে আগামী রোববার আবারও বৈঠক হবে। আমরা সেই বৈঠককে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি নিচ্ছি। সব মালিকদের সঙ্গে কথা বলছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন অনুরোধ করা হলেও আমরা জানিয়েছে, বিআরটিএর রুট পারমিট অনুযায়ী আমরা পরিবহন পরিচালনা করছি। আমাদের রুট পারমিট আইনসিদ্ধ। হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে বৈধ একটা বিষয়কে অবৈধ করা যায় না। এজন্য আলাপ-আলোচনা করতে হবে। পরিকল্পনামাফিক এগুতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম বলেন, ‘সিটির ভেতরে যেসব লেগুনা চলে সেগুলো আমরা সরিয়ে দেব। ঢাকার পাশের এলাকাগুলোতে লেগুনা চলবে, যা এখনও চলছে। মূল সড়কের কিছু কিছু জায়গায় এসব পরিবহন চলাচল বন্ধ হয়েছে। আবার কিছু জায়গায় চলছে। আমরা সবগুলো বন্ধ করতে কাজ করছি।’
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, পরিবেশ দুষণের কারণে ২০০২ সালে তিন চাকা অটোটেম্পু ঢাকা মহানগর থেকে উচ্ছেদ করা হয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পরিবেশবান্ধব লেগুনা (হিউম্যান হলার) চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজার ১৫৬টি হিউম্যান হলারের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। রাজধানীতে গণপরিবহনের ২৫১টি রুটের আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) প্রায় ১৫৯টিতে এসব গাড়ি চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ফার্মগেট থেকে মিরপুর ১০, ফার্মগেট থেকে মহাখালী, ফার্মগেট থেকে জিগাতলা, ফার্মগেট থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে নিউমার্কেট, ট্যানারি মোড় থেকে নিউমার্কেট, গাবতলী থেকে বাড্ডা ভায়া মহাখালী-গুলশান- উত্তরা মাস্কট প্লাজা ও দিয়াবাড়ি, গুলিস্তান থেকে মালিবাগ রেলগেট-সিপাহীবাগ-গোড়ান, ডিএসসিসি নগর ভবন থেকে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা অন্যতম। বর্তমানে এই রুটগুলোকে ভিআইপি বা প্রধান রোড হিসেবে দেখছে ডিএমপি।
এতদিন যেসব লেগুনা চলেছে তার কোনও রুট পারমিট নেই, সব অবৈধভাবে চলছে- ডিএমপি কমিশনারের এমন বক্তব্যের বিষয়ে মো. গোলাম ফারুক বলেন, ‘এটা সঠিক নয়। এই সড়কগুলোতে আমাদের রুট পারমিট রয়েছে। তবে এই সড়কগুলো থেকে এখন আমাদের লেগুনা সরিয়ে নিতে অনুরোধ করা হচ্ছে। ডিএমপির হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিপাকে ফেলবে।’এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সবার সঙ্গে বৈঠক করেছি। আগামী রবিবারের বৈঠকে আমরা ডিএমপির কাছে অনুরোধ করবো যাতে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তারা। যদি আমাদের দাবি মানা না হয় তাহলে কর্মসূচিসহ অন্য সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
জানতে চাইলে বিআরটিএ পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মো. মাহাবুব-ই-রব্বানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডিএমপি কমিশনার কিসের ভিত্তিতে এই ঘোষণা দিয়েছেন তা আমরা জানি না। বিষয়টি তিনিই বলতে পারবেন।’
এ বিষয়ে আরটিসি কমিটির সদস্যসচিব ও বিআরটিএ’র উপপরিচালক মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘এই পরিবহনগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ফিডার রোডে (প্রধান সড়কের বাইরের সড়ক)। কিন্তু দেখা গেছে, এগুলো এখন প্রধান সড়কে চলে। তাছাড়া আপনারা তো জানেন লেগুনাগুলো লক্কড়-ঝক্কড়। রোড সেফটির জন্য হুমকিস্বরূপ। আর ডিএমপি কমিশনার আরটিসি কমিটির সভাপতি। সে কারণেই ডিএমপি কমিশনার এমন ঘোষণা দিতে পারেন।’ তিনি জানান, এ ধরনের পরিবহন চালানোর অনুমতি শুধু ফিডার রোডে রয়েছে। ফিডার রোড ছাড়া প্রধান সড়কে চলতে পারবে না।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো-রিকশা অটোটেম্পু পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা শহরে চলাচলরত লেগুনা (হিউম্যান হলার) কোনও ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বন্ধের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের ফরমান জারি আইনসঙ্গত নয়। এই গাড়ি শুধু যাত্রী পরিবহনই করে না, ঢাকা শহরসহ দেশের প্রতিটি থানায় রাষ্ট্রীয় কাজেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুলিশ রিকুইজিশন দিয়ে প্রতিটি থানায় কমপক্ষে একটি করে যানবাহন নিয়ে থাকে। তাই মাথা ব্যথা হলে মাথা কাটা নীতি পরিহার করে বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে সময়োপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
বিআরটিএ কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া হুট করে কোনও পরিবহনের রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট বাতিল করা যায় না। নিয়ম ও আইনের মধ্য থেকে পদক্ষেপ নিতে হয়। বর্তমানে যেসব রোডকে প্রধান বা ভিআইপি হিসেবে ধরা হচ্ছে প্রথমে সেগুলোকে ফিডার রোড থেকে বাদ দিতে হবে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ঢাকা জেলা হালকা যানবাহন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘এই পরিবহনগুলো ফিডার রোডে চলাচল করছে, যেসব রোডে কোনও বাস সার্ভিস নেই। তাছাড়া এসব সড়কে খুবই নিম্নআয়ের মানুষ চলাচল করে। হঠাৎ করে বন্ধ করে দিলে জটিলতা দেখা দেবে। কারণ যেসব পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে সেগুলো তো কোনও পদ্ধতি অবলম্বন না করে বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। মালিকদের সময় দিতে হবে। এমন কোনও পরিস্থিতি হলে প্রতিকার পাওয়ার জন্য মালিকরা আদালতের শরণাপন্নও হতে পারেন।’