বুধবার (০৩ অক্টোবর) বিকালে পিবিআই ঢাকা মেট্রো বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘এমএলএম ব্যবসার নামে গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত যুবকদের সঙ্গে একটি চক্র প্রতারণা করে আসছিল। প্রতারক চক্রটি চাকরি দেবার কথা বলে যুবকদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত নিরাপত্তা জামানত নিতো। তাদের নিয়োগ দেওয়ার পর পুনরায় তাদের মাধ্যমে আবার চাকরিপ্রার্থীদের আনতে বলতো এসব চাকরি প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিতে পারলে সেখান থেকে কিছু টাকা ভাগ করে দিতো। এভাবেই এই চক্রটি প্রতারণা করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এই চক্রটিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
গ্রেফতার হওয়াদের মধ্যে রয়েছে- প্রতারক চক্রের শাখা প্রধান মো. নাহিদ নজরুল (২৩) তার সহযোগি মো. রুবেল মিয়া (১৮), মো. জুনায়েদ (১৯) ও মো. নাজমুল হোসাইন (২৪)। কোম্পানির মালিক পরিচয়দানকারী নাহিদ নজরুলের বাড়ি নাটোরের গুরুদাসপুর। চক্রটির সঙ্গে জড়িত আব্দুল কাদের, নাসির হায়দার খান, জিয়াউর রহমান, আলতাফ হোসেন, আশরাফ হোসেন কবির, আবু নছর ও নজরুল ইসলামসহ আরও অজ্ঞাতনামা ৮/১০ জন পলাতক। তাদের গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনা করছে পিবিআই।
আবু হানিফ (২১) নামে এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের মঙ্গলবার (০২ অক্টোবর) উত্তরা পশ্চিম থানার ৭ নম্বর সেক্টরের ৮৭ নম্বর বিএনএস সেন্টার বিল্ডিংয়ের ৫ম তলা থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই ঢাকা মেট্রো একটি বিশেষ টিম।
প্রতারণার শিকার ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার আবু হানিফের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতারকদের আটক করা হয়।
আবু হানিফ অভিযোগ করেন, স্থানীয় বন্ধু মেহেদী হাসান মোবাইলফোনে আকর্ষণীয় চাকরির প্রস্তাব দেন। চাকরিতে যোগদান করলে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা বাবদ কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা জমা রাখার কথা জানানো হয় তাকে। আর তাকে সুপারভাইজার পদের বিপরীতে ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে আবু হানিফ প্রস্তাবে রাজি হয়ে ৫ মার্চ চাকরির জন্য উত্তরায় আসেন। সেখানে তিনি লাইফওয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড নামক কোম্পানিতে যান। কোম্পানির মালিক পরিচয়দানকারী নাহিদ তার ভাইভা নেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজে তার স্বাক্ষর এবং চাকরির জন্য থাকা, খাওয়া ও ট্রেনিং বাবদ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে নেন নাহিদ। এরপর হানিফকে উত্তরা আজমপুরে একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই আরও ৭/৮ জনকে রাখা হয়েছিল।
অভিযোগে হানিফ আরও বলেন, বাসা থেকে কোথাও বের হলে ওই কোম্পানির এক লোক তাদের সঙ্গে থাকতো। এমনকি মোবাইলে কথা বলার সময় তাদের একজন লোক পাশে থাকতো এবং রাত্রে ঘুমানোর সময় বাইরে থেকে ঘরের দরজার তালা বন্ধ করে রাখা হতো। পরে অন্য একটি জায়গায় ফ্ল্যাটের ভেতরে তাদের ট্রেনিং করানো হয়। ট্রেনিংয়ে বিভিন্নভাবে তাদেরকে লোক আনার কৌশল শেখানো হয়। লোক নিয়ে আসতে পারলে তাদের বেতন হবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নাহিদ, হায়দার কবির মিঠু, আব্দুল কাদের, রুবেল ও জুনায়েদ ট্রেনিং পরিচালনা করতেন। তাদের শেখানো কৌশলে হানিফ এলাকা থেকে দু্ই যুবককে নিয়ে আসেন। তাদের কাছ থেকে একই কৌশলে টাকা আদায় করে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন হানিফ। ওই টাকা থেকে তাকে বেতন হিসেবে চার হাজার টাকা দেয় কোম্পানিটি। পরে তাকে আরও লোক নিয়ে আসার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এ অবস্থায় হানিফ নিজের রাখা জামানত ফেরত চাইলে প্রতিষ্ঠান তার টাকা ফেরত না দিয়ে ছুটিতে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। আসামিদের কার্যকলাপে আবু হানিফ বুঝতে পারেন যে, তিনি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
হানিফের হাত ধরে কাঠালিয়া উপজেলার মো. মারুফ বিল্লাহ ২৫ এপ্রিল ওই কোম্পানিতে যোগ দেন। পরে ৫ মে তিনি ৫৩ হাজার টাকা জামানত রাখেন। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মো. মিলন নামে এক যুবকের কাছ থেকে ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা, মো. সোলাইমান এর কাছ থেকে ৫৩ টাকা এবং মো. মিরাজ হোসেনের কাছ থেকে ৫৩ হাজার টাকা সহ আরও অসংখ্য যুবককে চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা-পয়সা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রতারক চক্র কর্মীদের আটকে রেখে কৌশলে তাদের মাধ্যমে পরিচিত বন্ধু-বান্ধব ও এলাকার স্বল্প শিক্ষিত লোকজনদের চাকরি দেওয়ার কথা বলে অফিসে নিয়ে আসতো। এভাবেই চলতো তাদের প্রতারণার চক্র।
পিবিআই সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় লাইফওয়ে বাংলাদেশ (প্রা.) লি. নামক কোম্পানির শাখা অফিস ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লোকজনদের টার্গেট করে প্রতারণা চালিয়ে আসছে একটি চক্র। চাকরি দেওয়ার নামে কৌশলে তারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও জানায় পিবিআই।