সড়কে ভয়ঙ্কর ঢাকনাযুক্ত ম্যানহোল

কারওয়ান বাজার টিসিবি মোড সংলগ্ন ফ্লাইওভার এলাকায় ম্যানহোলের গর্তে সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাজধানীর সড়কগুলোতে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের পাশাপাশি এবার ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে ঢাকনাসহ ম্যানহোল। এসব ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো সড়কের সমান সমতল না হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। কোথাও সড়কের সমতল থেকে অনেক উঁচু আবার কোথাও অনেক নিচু। ফলে সড়কগুলো হয়ে পড়েছে অনিরাপদ। বাড়ছে দুর্ঘটনা। এ নিয়ে খোদ দুই সিটি করপোরেশনেরই কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ) এলাকার নতুন বাজার থেকে বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল হয়ে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত সড়কে অন্তত শতাধিক ম্যানহোল রয়েছে যেগুলোর ঢাকনা সড়কের সমতল নয়। একই অবস্থা দেখা গেছে বাসাবো থেকে গোড়ান পর্যন্ত সড়কে। এই সড়কটিতে অন্তত দুই শতাধিক এমন ম্যানহোল রয়েছে। পান্থপথ ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে স্কয়ার হসপাতাল পর্যন্ত সড়কেও রয়েছে অন্তত তিনটি দুর্ঘটনাপ্রবণ ম্যানহোল। মোহাম্মদপুর তাজমহল রোড ও তার আশপাশের বেশ কয়েকটি সড়ক, শিয়া মসজিদ থেকে সাত মসজিদ পর্যন্ত সড়ক ও মোহাম্মদিয়া হাউস বিল্ডিং এলাকায় অনেক বড় বড় গর্ত রয়েছে। এফডিসি মোড থেকে কারওয়ান বাজার টিসিবি ভবন পর্যন্ত সড়কে বেশ কয়েকটি গর্ত দেখা গেছে।
ম্যানহোলের কারণে বিড়ম্বনার মুখে প্রাইভেটকার যানবাহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর সড়কগুলোতে প্রায় যানজট লেগে থাকে। সড়কে চলাচলের সময় একটি যানবাহন অপর যানবাহন থেকে সামান্য ফাঁকা রেখে চলাচল করে। ফলে সামনের যানবাহনের কারণে পেছনের যানবাহন ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানহোল দেখতে পায় না। এতে বড় চাকার যানবাহনগুলো দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেও প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাগুলো মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। আর যানবাহনে একটু গতি থাকলে হঠাৎ করে ব্রেক করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বছর বছর উন্নয়ন করার কারণে সড়কগুলো ম্যানহোলের ঢাকনা থেকে অন্তত ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি উঁচু হয়ে গেছে। ফলে ঢাকনার ওপরের অংশগুলো বড়বড় গর্তে পরিণত হয়েছে। আবার কোথাও-কোথাও দেখা গেছে ঢাকনাগুলো অনেক উুঁচু। সড়কে চলাচলের সময় অসতর্ক অবস্থায় এসব গর্তে পড়ে যানবাহনগুলো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত যানবাহনগুলো বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
ম্যানহোলের গর্তে পড়ে বেসরকারি একটি রেডিও’র সংবাদকর্মী ফিরোজ ইবনে মিজান সম্প্রতি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর গুলশান-২ নম্বর থেকে মহাখালী যাওয়ার পথে ম্যানহোলের উঁচু ঢাকনার সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগে। এতে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে তার বাম হাত ভেঙে যায়।
ম্যানহোলের গর্তে পড়ে গণমাধ্যমকর্মী ফিরোজ ইবনে মিজারে হাড় ভেঙে গেছে (এক্স-রে রিপোর্ট)তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু আমি নয়, অনেকেই রাস্তার ম্যানহোলে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এটা খুবই ভয়ঙ্কর। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করেছে সেখানে সিটি করপোরেশন এখনও কোনও ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। আমার দাবি, সিটি করপোরেশন যেন এসব ম্যানহোল রাস্তার সঙ্গে সমতল করে নির্মাণ করে।’
একইভাবে গত ২২ ফেব্রুয়ারি, কারওয়ান বাজার টিসিবি মোড সংলগ্ন ফ্লাইওভার থেকে নামার অংশে ম্যানহোলের গর্তে পড়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে ওই সিএনজির দুই যাত্রী মারাত্মক আহত হন। পরে তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই সময় সিএনজি চালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি ব্যস্ততম সড়কে যদি ম্যানহোলের মুখগুলোর অবস্থা এই হয়- তাহলে নিরাপদ সড়ক কীভাবে নিশ্চিত হবে। দুর্ঘটনা তো ঘটবেই।’
বাড্ডার বাসিন্দা ও সিএনজি চালক মিজার উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত জুনের শেষ সপ্তাহে বড় একটি বাসের পেছনে ৪০ কিলোমিটার বেগে সিএনজি চালাচ্ছি। বাসটির চাকা অনেক বড়, ম্যানহোলের ওপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু আমার সিএনজির চাকা ছোট। হঠাৎ করেই ম্যানহোলের গর্তে পড়ে গেলাম। হার্ড ব্রেক করেছি। কিন্তু কাজ হয়নি। এরই মধ্যে পেছনে থাকা গাড়িটি জোরে ধাক্কা দিলো। আমার সিএনজির ব্যাপক ক্ষতি হলো। দুই যাত্রী মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। সিটি করপোরেশনের ভুলের খেসারত দিচ্ছি আমরা। একটা রাজধানীতে এমন সড়ক আশা করা যায় না।’
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মো. জামাল মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উন্নয়ন কাজ করায় বছর বছর রাস্তাগুলো উঁচু হচ্ছে। কিন্তু ম্যানহোলগুলো উঁচু হচ্ছে না। সে কারণে ম্যানহোলের ওপর গর্তের মতো সৃষ্টি হয়। আমরা বেশকিছু ম্যানহোল চিহ্নিত করেছি। সেগুলো এরই মধ্যে সংস্কারের কাজ চলছে।’
একই কথা বলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল। তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ ম্যানহোল ঢাকা ওয়াসার। আমরা ম্যানহোলগুলো ঠিক করার কাজ শুরু করেছি।’