বর্তমানে বাবার পরিচয় নিশ্চিতের জন্য উচ্চ আদালতের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন জুয়েল। চান ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে যেন বাবার পরিচয় নিশ্চিতের আদেশ দেন আদালত। তার এই আবেদন নিয়ে আদালতে লড়ছেন জাতীয় আইন সহায়তা প্রদান সংস্থার অ্যাডভোকেট চঞ্চল কুমার বিশ্বাস ও অ্যাডভোকেট সোনিয়া।
নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান জুয়েল। তিনি বলেন, ‘আমার মায়ের নাম রাশেদা আয়না, বাবার নাম মো. রফিকুল ইসলাম জুম্মা। রাজশাহী জেলার পুঠিয়া থানার বলবলিয়া গ্রামে আমার বাড়ি।’
জুয়েল দাবি করেন, ‘আমার বাবা রফিকুল ইসলাম শরিয়ত মতে আমার মাকে বিয়ে করেছিলেন। তবে বিয়ের কোনও আইনগত কাগজ ছিল না। পরে আমি যখন মায়ের পেটে, তখন আমার পিতৃ পরিচয়ের বিষয়ে গ্রামে একটি সালিশ হয়। কিন্তু আমার বাবা সেই সালিশ মানেননি। পরে আমার জন্মের বেশ কয়েক বছর পর ২০০৮ সালে আমার মা রাজশাহী কোর্টে একটা মামলা করেন। আমার আর মায়ের ভরণ-পোষণের দাবিতে করা সেই মামলায় শেষ পর্যন্ত আমরা হেরে যাই।’
রাজশাহীর আদালতে মামলা হেরে যাওয়া প্রসঙ্গে জুয়েল বলেন, ‘আদালত তখন বলেছে, এক নম্বর বাদী বিয়ে প্রমাণ করতে পারেনি।’
তবে জুয়েলের দাবি, ‘কোর্ট যদি আমার আর বাবার ডিএনএ টেস্ট করতে দিতেন তাহলেই আমি যে তার ছেলে সেটা প্রমাণ হয়ে যেতো। কিন্তু কোর্ট সেটা করেননি। তাই আমি কোর্টে হেরে গেছি। আমি চাই, কোর্ট বাবার সঙ্গে আমার ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দিক। তাহলেই আমি আমার পিতৃ পরিচয় পাবো।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এবং বিজ্ঞ আদালত অনুগ্রহ করলে নিজের পরিচয় পাবেন, নিজের বাবাকে বাবা বলে ডাকতে পারবেন বলে জানিয়েছেন জুয়েল।
জুয়েল স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে নিজের ও মায়ের জীবন বাঁচাতে একটি চাকরি দাবি করেছেন।
জুয়েল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মা আমাকে বলেছে আমার জন্ম তারিখ ১৯৯৩ সালে। সেই হিসেবে আমার বয়স ২৪ বছর। কিন্তু আমার জন্ম নিবন্ধন সনদে লেখা আছে ৭ আগস্ট ১৯৯৭ সেই হিসাবে আমার বয়স এখন ২১ বছর। আমার চেহারা আর বাবার চেহারা দেখতে হুবহু এক।’
জুয়েলের মা রাশেদা আয়না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ওদের (রফিকুল ইসলাম জুম্মা) বাড়িতে কাজ করতাম। তখন সে আমাকে বিয়ে করেছিল। এটা নিয়ে গ্রামে সালিশ বসে। সালিশে তার মা-বাবা-ভাই আমাকে মেনে নেয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওরা খুব টাকা-পয়সা ওয়ালা, তাই গাঁয়ের কেউ ওদের মুখের উপর কোনও কথা বলতে পারে না।’
জুয়েলের বাবা রফিকুল ইসলাম এসএসসি পাস করে ম্যাটসের চার বছরের ট্রেনিং নেন। পরে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
জুয়েলের দেওয়া নম্বরের সূত্র ধরে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে নিজে রংপুরে থাকেন জানিয়ে রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি এখন ব্যস্ত আছি। আপনার সাথে আমার কোনও দরকারি কথা নেই।’ তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনাকে যে অভিযোগ দিয়েছে আপনি তার সঙ্গে কথা বলেন।’
জুয়েল পিতৃ পরিচয়ের দাবিতে যে লড়াই করছেন সে সম্পর্কে জানিয়েছেন নব্বইয়ের দশকের সেখানকার স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুয়েলের জন্ম ও তার বাবা-মায়ের বিয়ে নিয়ে যখন সমস্যা হয় তখন আমি ওই এলাকার চেয়ারম্যান ছিলাম। এটা ৯১-৯২ সালের দিকের ঘটনা। গর্ভবতী হয় ওই মেয়ে (রাশেদা আয়না) আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই এলাকায় আমি একটা সালিশ বৈঠক ডাকি। তখন ছেলের পক্ষের লোকদের মিথ্যা সাক্ষী দেওয়াকে কেন্দ্র করে সালিশ ভেঙে যায়। কোনও সমাধান হয় না। পরে আমি ওই মেয়েটাকে আইনের আশ্রয়ে যেতে বলি। তবে কীভাবে যেন মামলাটা ডিসমিস হয়ে গেল।’
সাবেক চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান নিজের বয়সের কথা উল্লেখ করে জানান, জুয়েল ও তার মা সঠিক বিচার পেয়েছেন, এমনটা দেখে যেতে চান। তাদের ন্যায় বিচার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।
জুয়েলের দাবির আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিম্ন আদালতের রায়ের তিন-চার বছর পর আমরা হাইকোর্টে এসে রিভিশন করেছি। ডিডের ওপর রুল হয়েছে। রুল শুনানির পরে এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত জানাতে পারবো।