যেভাবে পরিবহন খাতে নৈরাজ্যের পরিকল্পনা





এক চালককে কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছে (ছবি: ফোকাস বাংলা)
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবিকে সামনে রেখে পরিবহন খাতে নৈরাজ্যের পরিকল্পনা করেছে মালিক ও শ্রমিকদের কিছু সংগঠন। এমনটাই অভিমত পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের।

আট দফা দাবিতে গতকাল রবিবার থেকে ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশন। সেটি শেষ না হতেই এবার ৯৬ ঘণ্টা ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে তারা। সংগঠনটি বলছে, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর সংস্কারসহ তাদের আট দফা দাবি ২১ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না দিলে টানা ৯৬ ঘণ্টা ধর্মঘট পালন করা হবে।

এর আগে সাত দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পণ্যপরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ঢাকা বিভাগের প্রতিটি জেলায় পণ্যপরিবহন ধর্মঘট পালন করে।

তবে চলমান এসব আন্দোলনকে সরকারবিরোধীদের চক্রান্ত হিসেবে দেখছে এ খাতের অন্য সংগঠনগুলো। তারা বলছে, যারা কোনও আলাপ-আলোচনা ছাড়াই হুট করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তারা সরকারবিরোধী ও বিএনপি-জামায়াতের মদদপুষ্ট। তাদের সঙ্গে সরকারসমর্থিত সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা নেই। এছাড়া এসব আন্দোলনের ধরনই বলে দিচ্ছে তারা সহিংসতা চাইছে। নৈরাজ্য চাইছে।

গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় সারাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভায় সড়ক পরিবহন আইন অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর দশম জাতীয় সংসদের ২১তম অধিবেশনে সেটি পাস হয়। এরপর বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন থেকে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বিবৃতি দেওয়া হয়।

এমন পটভূমিতে গত ৬ অক্টোবর রাজধানীর ফুলবাড়িয়ায় একটি সমাবেশ থেকে পণ্যপরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের হয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান হিরু সাত দফা দাবি উত্থাপন করে ধর্মঘটের ডাক দেন। এসময় তারা সরকারকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। অন্যথায় ১৩ অক্টোবর থেকে সারাদেশে লাগাতার পরিবহন ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। যদিও ৯ অক্টোবর সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।



ট্যাক্সির এক চালক পোড়া মোবিল দেখাচ্ছেন (ছবি: ফোকাস বাংলা)

পণ্যপরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকা ধর্মঘট পালনের সময় ৭ অক্টোবর বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর, শ্রমিক ও চালকদের ওপর হামলাসহ লাইসেন্স খতিয়ে দেখার নামে চালকদের মুখে ইঞ্জিনের পোড়া তেল লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘটেও।
গত শনিবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশ থেকে আট দফা দাবিতে সারাদেশে টানা ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশন। এই কর্মবিরতি একপর্যায়ে ধর্মঘটে পরিণত হয়। ধর্মঘট চলাকালে সাধারণ যাত্রী, বিভিন্ন প্রাইভেটকার চালক, মটরসাইকেল চালক ও শিক্ষার্থীদের মুখে পোড়া মবিল মেখে দেওয়া ও তাদের কান ধরে ওঠবস করানোর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। যদিও আন্দোলনের ডাক দেওয়া ফেড়ারেশনের নেতারা বলছেন, যারা ধর্মঘট বিরোধী এবং দুস্কৃতিকারী তারাই এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে।

এর আগেও দেশে বিভিন্ন সময় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নানা দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন কর্মসূচির নামে যাত্রীদের পাশাপাশি সরকারকে জিম্মি করার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এছাড়া পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙা। তারা এর সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরাসরি আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও কথা বলছেন না।
তবে শ্রমিকদের এ আন্দোলনকে অযৌক্তিক বলছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সম্প্রতি জাতীয় সংসদে যে আইন পাস হয়েছে সেটি অধিকাংশ শ্রমিকদের পক্ষেই রয়েছে। আইনটিতে যেসব শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে সেটি পর্যাপ্ত নয়। এরপরও শ্রমিকদের আন্দোলন প্রমাণ করে আসলেই তারা কী চান, তা তাদের কাছেই স্পষ্ট নয়।

আন্দোলনের মাধ্যমে আবারও পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ‘অযৌক্তিক’ দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
এক চালকের মুখে পোড়া মোবিল লাগিয়ে দিচ্ছে ধর্মঘট আহ্বানকারী শ্রমিকরা (ছবি: ফোকাস বাংলা)

পণ্যপরিবহন ধর্মঘটের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছিলেন, যেসব কারণে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে সেগুলো অযৌক্তিক। যারা আন্দোলন ডেকেছে তাদের সঙ্গে শ্রমিকরা নেই। বরং তারা আন্দোলন ডেকে আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অথচ গতকাল রবিবার থেকে ৪৮ ঘণ্টার কর্মবিরতির ডাক দেয় এই শ্রমিক নেতার নেতৃত্বাধীন সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশন। এ ধর্মঘটের যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের আট দফা দাবিতে আমরা স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছি। এইগুলো সংশোধন করতে হবে।’
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— সড়ক দুর্ঘটনায় সব মামলা জামিনযোগ্য করতে হবে। শ্রমিকদের অর্থদণ্ড পাঁচ লাখ টাকা করা যাবে না। সড়ক দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি রাখতে হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করতে হবে ইত্যাদি।

তবে ধর্মঘট চলাকালে বিভিন্ন প্রাইভেটকার ও মোটর সাইকেল চালক ও শিক্ষার্থীদের মুখে পোড়া মবিল মাখানোর ঘটনার জন্য ওসমান আলী ধর্মঘটবিরোধীদের দায়ী করেন। বলেন, ‘আমরা পুলিশ কমিশনারকে বলেছি যারা এমন কাণ্ড ঘটাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আমরা তো কর্মবিরতি পালন করছি। কোনও বিশৃঙ্খলা হওয়ার কথা না।’
দাবি আদায় না হলে আবারও ৯৬ ঘণ্টা ধর্মঘট দেওয়া হবে— এ বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যায় ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের চলমান কর্মবিরতি আগামীকাল ভোর ৬টা পর্যন্ত চলবে। এরপর পরিবহন চলবে। আগামীকাল থেকে ২১ দিন সময় দিয়ে আমরা সরকারকে চিঠি দেবো। দাবি মেনে না নিলে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘটে যাবো।’
এই ধর্মঘট আহ্বানকারীদের সঙ্গে বিএনপি জামায়াতের সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই নেতা বলেন, ‘যারা এমন অভিযোগ করছে তারা বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবের সময় কোথায় ছিলেন? আমরা তো রাস্তায় ছিলাম। আমাদের ৯২ জন শ্রমিক নিহত ও ১৮০ জন পঙ্গু হয়েছে। এখন সেই সরকারের হাতেই যদি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই তাহলে বিষয়টি মানা যায় না।’
এর আগে পণ্যপরিবহন ধর্মঘট আহ্বানকারী সংগঠনের আহ্বায়ক মুকবুল আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক ছিল। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আশ্বাসে সেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছি।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এজন্য আলাপ-আলোচনা হতে পারতো। তাছাড়া সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীও বলেছেন, আগামী অধিবেশনের আগে এটা সংশোধনের সুযোগ নেই। সবার সঙ্গে কথা বলে সমাধান করা যেতো। সড়ক পরিবহন আইনের যে সংশোধনের বিষয় রয়েছে আমরা সেগুলো নিয়ে আইনমন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছি।’
ধর্মঘট সমর্থকদের হাত থেকে নিস্তার পাননি মোটর সাইকেল চালকও (ছবি: ফোকাস বাংলা)

তবে পণ্যপরিবহন ধর্মঘটের সময় এই পরিবহন নেতা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘এটা একটা ফাজলামি। কোথাও কোনও ধর্মঘট হচ্ছে না। তারা কিছু কিছু স্থানে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এখানে দুই-তিনটি সংগঠন রয়েছে। তারা বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারের শেষ মুহূর্তে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায় তারা। পরিবহন খাতের স্থিতাবস্থা নষ্ট করে ফায়দা লুটতে চায়।’
এ ধর্মঘটকে ‘অবৈধ’ অভিহিত করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ। তাদের দাবি, ফেড়ারেশনের নেতারা বিএনপি, জামায়াত ও বাসদের মদদপুষ্ট। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুর আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘আগামী নির্বাচন উপলক্ষে যখন দেশে উৎসবমুখর নির্বাচনি প্রচারণা চলছে, ঠিক তখনই বিএনপি-জামায়াতের মদদপুষ্ট সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন কর্মবিরতির নামে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ অশান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। গতকাল (২৭ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে পরিবহন শ্রমিক সমাবেশের নামে যারা বক্তব্য রেখেছেন, তারা অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ওই মিটিংয়ে ফেডারেশনের সভাপতি ওয়াজ উদ্দিন খানের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি।'
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আইনটা তো তাদের মর্জিমতো করে নিয়েছে। সেখানে তাদেরই সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের সদস্যরা ছিল। কমিটিতে আমাদের যাত্রীদের পক্ষ থেকে কেউ ছিল না। এরপরও তাদের আপত্তি।’ তিনি বলেন, ‘এখন তারা জনগণের চোখ ভিন্ন দিকে নেওয়ার জন্য অপচেষ্টা করছে। এটা একটা ঘৃণিত কাজ। সব সময় তারা সরকারকে জিম্মি করার চেষ্টা করেছে।’
জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াছ কাঞ্চন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ধর্মঘট কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। আইনটি পাসের পর তারা কিন্তু সন্তুষ্টি প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বিবৃতিও দিয়েছে। এরপর আবার কেন ঘর্মঘট? সেটা সরকারকে বুঝতে হবে। যারা এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে তাদের নেতাদের অনেকেই সরকারের মন্ত্রিপরিষদেও রয়েছে। সরকারের শেষ মুহূর্তে এমন আন্দোলন সরকারকে বেকায়দায় ফেলবে। এ কারণে আবারও পরিবহন সেক্টরে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হতে পারে।’