পল্লবী থানা পুলিশের টহল গাড়িবুধবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট। পল্লবী থানার সামনে একজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে এক লোক কথা বলছিলেন। একটু কাছে এগিয়ে যেতেই শোনা যায়, ‘স্যার আমার ছোট দুইটা সন্তান আছে ওদের ফ্যালাইয়া বউ বাপের বাড়ি চইলা গেছে। কতদিন হলো আসেও না, পোলা-মাইয়ার খোঁজও নেয় না। আমি একা মানুষ, চায়ের দোকান করি। দুই পোলা-মাইয়া বাসায় একলা রাইখা যাই। পোলা-মাইয়ার মুখের দিকে তাকাইলে আমি চোখের পানি ধইরা রাখতে পারি না স্যার। এখন আমি কি করি?’
কান্নাজড়িতে কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ওই লোক। বিস্তারিত শুনে ওই পুলিশ সদস্য তাকে বললেন,‘স্যার আসুক দেখি কি করা যায়।’ এরপর ওই পুলিশ সদস্য সামনের দিকে গেলেন এবং ভুক্তভোগী থানার পাশে থাকা একটি কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে গিয়ে বসলেন। ওই দোকানের ভেতরে একজন পুলিশ সদস্যকে বসে থাকতে দেখা যায়। আর পাশের কম্পিউটার টেবিলে বসে টাইপ করায় ব্যস্ত ছিলেন একজন। দোকানের ভেতরে চেয়ারে আরও কয়েকজন বসেছিলেন।
ভাড়া বাসায় পল্লবী থানা সরেজমিনে দেখা যায়, কম্পিউটার কম্পোজের এই দোকানে আরও কয়েকজন ছিলেন। অভিযোগ লিখে নিতে এসেছেন তারা। অভিযোগ কি? বলতেই দ্রুত কস্পোজ করে দিচ্ছেন ওই দোকানি। একজন ভুক্তভোগী জানান, জিডি করতে এসেছি, লেখার নিয়ম জানি না। তাই এখানে এসে তাদের একটু সহায়তা নিলাম। সময় কম লাগলো। দোকানি এজন্য ৫০ টাকা নিয়েছে। পাশে থাকা চায়ের দোকানি জানান, ‘এই দোকানে থানার কাজই বেশি হয়। জিডি/অভিযোগ লেখা হয়।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে থানার ডিউটি অফিসার মো. সহিদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘এটি থানার কোনও অংশ নয়, দোকানটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। সাধারণ মানুষ যারা জিডি বা মামলার এজাহার লিখতে পারে না, তাদের জন্য একটু সুবিধা হয়, এই আর কি। সেখানে বিভিন্ন ফরমেট আছে, ওদের কাছে গিয়ে ঘটনা বললে দ্রুত লিখে দেয়। এতে থানার কোনও লাভ নাই। ওরা বাইরের লোক। ভুক্তভোগীকে জিডি অথবা অভিযোগ লিখতে তারা সাহায্য করে। এ কারণে ভুক্তভোগীরা ২০/৫০/১০০ টাকা দেয় তাদের। এতে তাদের উপার্জনের একটি ব্যবস্থা হয়।’
জব্দ করা যানবাহন সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে পল্লবী থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে দুইজন নারীকে বসে থাকতে দেখা যায়। ডিউটি অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো.সহিদ। পাশের টেবিলে বসেছিলেন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. খালেক। কিছুক্ষণ পর তারা দুইজনই থানা থেকে বের হয়ে একটি রিকশায় উঠছিলেন। সেই সময় জাকিয়া সুলতানা নামে এক ভুক্তভোগী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘ আমার স্বামী ইসমাইল হোসেন (৩৮) একজন গাড়ি চালক। আট বছরের দাম্পত্য জীবনে আমাদের একটি ছেলে আছে। কিন্তু কথায়-কথায় আমার স্বামী দোষ ধরে, আমাকে মারধর করে। ভেবেছিলাম একটি সন্তান হলে ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু নির্যাতন কমেনি। আজও আমাকে মারধর করছে, একপর্যায়ে বটি দিয়ে কোপ দিয়েছে। আমি হাত দিয়ে ফিরাইছি। হাত কেটে গেলেও প্রাণে বেঁচে যাই। সহ্য করতে না পেরে থানায় অভিযোগ করতে এসেছিলাম। কিন্তু পুলিশ বলছে, মেডিক্যাল সার্টিফিকেট লাগবে। এখন মেডিক্যাল সার্টিফিকেট আনতে যাচ্ছি।’
স্বামীর নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী নারী থানায় এসেছেন অভিযোগ জানাতেথানায় কী ধরনের অভিযোগ আসে জানতে চাইলে ডিউটি অফিসার এসআই সহিদ জানান, ‘দিনে ১০-১৫টা নারী নির্যাতন ও পরকীয়া সংক্রান্ত অভিযোগ আসে। বর্তমানে পরকীয়ার সমস্যাটা খুব বেড়ে গেছে। মানুষ যদি নিজেরা সচেতন না হয়, তবে এই ঘটনা দমানো সম্ভব নয়। থানা পুলিশ কি করবে? অভিযোগ নেবে আর কষ্ট করে হলেও আসামি ধরবে। তাতে কি সমাজ থেকে এই সমস্যা দূর হবে? না। কারণ এটি পারিবারিক সমস্যা। এটা পারিবারিকভাবেই সমাধান করতে হবে।’ এ সময় ডিউটি অফিসারের কক্ষে এসে একটি দরখাস্ত দেন তিনি। সেটি হাতে নিয়ে এসআই সহিদ পড়ে বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগেই এই আলোচনা করছিলাম, দেখেন কইতে-কইতে আবারও পরকীয়ার অভিযোগ আইসা হাজির।’
সড়কের পাশে ছয় তলা ভবন। বড় একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘পল্লবী থানা’। থানার সামনের দেওয়ালে লাগানো রয়েছে নির্বাচনি প্রচারণামূলক কয়েকটি পোস্টার। থানার ফটকের বাইরে সড়কেই স্থাপন করা হয়েছে ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড। থানার অপর পাশে কমিউনিটি সেন্টারের পাশে পড়ে আছে জব্দ করা সব যানবাহন। কোনও পার্কিং নেই বলে থানার গাড়িগুলো সড়কের পাশেই সারিবদ্ধভাবে রাখা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০ থানার মধ্যে পল্লবী থানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অস্থায়ী ভবন হওয়ার কারণে তাদের থাকার বেশ সমস্যা হয়। পর্যাপ্ত ব্যারাক নেই।
থানার ভেতরে রাখা সোফাথানায় ঢোকার সময় ফটকে দেখা যায়, বালুর বস্তা দিয়ে অস্থায়ীভাবে ব্যাঙ্কার তৈরি করে রাখা হয়েছে। থানার নিরাপত্তার দায়িত্বে একজন আনসার সদস্য। ভেতরে ঢুকতেই বাম পাশে ডিউটি অফিসারের কক্ষ এবং ডান পাশে থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষ। সামনে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষ। বাম পাশে থানা হাজতখানা এবং ডান পাশে দর্শনার্থী ওয়েটিং রুম। ওই রুমে ৫টি সোফা রয়েছে যার মধ্যে একটি সোফা ভাঙা। একটি টেবিল আর কয়েকটি চেয়ার রয়েছে, দেখে মনে হয়- এটি স্টোর রুম। এ সময় ওসির কক্ষটি বন্ধ ছিল। ওই দিন বিকাল থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলামের দেখা মেলেনি। থানার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান ‘স্যার এলাকায় আছেন, এখনও আসেননি। কখন আসবেন বলতে পারি না। রাত সাড়ে ৯টার দিকে দেখা মেলে ওসি নজরুল ইসলামের। এ সময় তার কক্ষে কিছু মানুষের ভিড়ও ছিল।’
ওসি বলছিলেন, ‘আমি প্রতিদিন সকালে-বিকালে হাজতখানায় আসামিদের জিজ্ঞাসা করি, খাবার ঠিক আছে কিনা? তারা জানায়, খাবার ভালো না, পরিমাণে কম, তরকারি মুখে দেওয়া যায় না।’ সামান্য উঁচু স্বরে ওসি বললেন, ‘এসব অভিযোগ আমার থানায় কেন থাকবে? দিনে প্রত্যেক আসামির খাবার খরচ বাবদ ৭৫ টাকা সরকার দেয়। কিন্তু আপনি এর মানসম্মত খাবার দেন? দেন না।’ জবাবে খাবার সরবরাহকারী বলেন, ‘স্যার আমি একটু বলি- খাবার তো ঠিকমতো দেই। আমি বাসা থেকে পাকাইয়া আনি। তারপরও যদি গন্ধ হয় তবে কাল থেকে আমি আরও ভালো করে খাবার দিমু। স্যার আমার দুই-তিনটা বিল ছিল, একটু দেইখেন।’
রাতে পল্লবী থানা এলাকা ওসি বলেন- ‘কোনও কথা শুনবো না।’ এ সময় একজন কনস্টেবলকে ডেকে বললেন, ‘আসামির খাবার নিয়ে আসো, আজ কি দিয়েছে সেটা আগে দেখি।’ এরপর খাবার দেখে ওই লোককে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখানে কয়জনের খাবার?’ উত্তর এলো ‘তিনজনের’। ওসি বলেন- ‘ভাত এতো বেশি, কিন্তু তরকারি কম কেন? এতে তিনজন খেতে পারে? আগে খাবারের মান ভালো করেন, পরে বিলের কথা বলবেন। আসামি আটক করি। ওরা অনেক কষ্টে থাকে। এর মধ্যে যদি খাবারটাও ভালো না হয় তাইলে কেমন হয়।’
থানা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিরপুর বিভাগের পল্লবী থানা। পল্লবীর সেকশন-১২, রোড ৯ এর সি-ব্লকের একটি ভাড়া ভবনে কার্যক্রম শুরু হয় এই থানার। তবে কালশীর ইসিবি চত্বরের পাশের পল্লবী থানার স্থায়ী কার্যালয় নির্মাণের কাজ চলছে। ভাড়া বাড়ি হওয়ার কারণে থানা ভবনের প্রতিটি কক্ষই প্রয়োজনের তুলনায় ছোট।
থানা চত্বরে অযত্নে পড়ে থাকা গাড়িখোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানা প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পর (২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর) পল্লবী থানায় একটি হাজতখানা তৈরি করা হয়, তবে সেটিও খুব বেশি বড় নয়। এর আগে পল্লবী থানার আসামি মিরপুর মডেল থানার হাজতে রাখা হতো। পল্লবী থানা এলাকায় মাদকদ্রব্য কতটুকু নিয়ন্ত্রণে জানতে চাইলে ওসি নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘আমি কি কখনও বলবো যে আমার দুধ খারাপ? এলাকা ঘুরে যদি মাদকের কোনও অভিযোগ পান তবে বলবেন, আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’ তিনি বলেন, মাদক কখনও নির্মূল করা হয় না। এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্যই তো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন হয়েছে, নির্মূল আইন নয়। মাদক কম-বেশি থাকবেই। পল্লবীতে অনেক বিহারি ক্যাম্প আছে সেগুলোতে এখনও মাদকে চলে।’
আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সক্রেটিসের ভাষায়- আইন হলো মাকড়শার জাল। এই জালে দুর্বল মানুষ পড়লে আটকে যাবে। আর সবল মানুষ হলে সেই জাল ছিঁড়ে বের হতে পারবে।’