জঙ্গিবিরোধী বিশেষায়িত ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা হিযুবতের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নজরদারি করছি। তারা গোপনে গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে শীর্ষ নেতৃত্বসহ সংগঠনের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
বাংলাদেশে ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে হিযুবত তাহরীর। সেসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। উচ্চ শিক্ষিত, মেধাবী ও উচ্চবিত্ত তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসা হিযবুত তাহরীরকে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এই কট্টরপন্থী সংগঠন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই হিযবুত তাহরীর মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিক্যালের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দলে টানার চেষ্টা করে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ‘পাঠচক্রে’র আয়োজন করে কার্যক্রম চালাতো হিযবুত তাহরীর। খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য হিযবুত তাহরীর শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও দলে টানার চেষ্টা করে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথমদিকে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিযবুতকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিং ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু করার পর জঙ্গি সংগঠন হিসেবে হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণা সেল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০১৫ সাল থেকে এই নভেম্বর পর্যন্ত হিযবুত তাহরীরের ৪৯ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। এদের বেশির ভাগই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হিযুবত তাহরীরের সদস্যরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞ হওয়ায় তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। মাঝে মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে বা মসজিদে নামাজ শেষে লিফলেট বিলি করে। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের পোস্টার দেখা গেছে। গত বৃহস্পতিবার (২২ নভেম্বর) রাজধানীর বাংলামটর এলাকায় লিফলেট বিলি করে তারা। জামাল উদ্দিন নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাংলামটর এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যালে বসেছিলেন। এসময় পাঁচ-ছয় জন যুবককে তিনি হিযবুত তাহরীরের লিফলেট বিলি করতে দেখেন। লিফলেটগুলোতে ক্ষমতাসীন সরকারকে হঠিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আহ্বানসহ রাষ্ট্রবিরোধী নানারকম বক্তব্য ছিল।
গত শনিবার (২৪ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে হিযবুত তাহরীরের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব-৪-এর একটি দল। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। বাকি চারজনের মধ্যে একজন একটি কোচিং সেন্টারের পরিচালক, তিনজন মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী।
র্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পোস্টার সাঁটানো ও লিফলেট বিলি করছে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে তাদের দলের নেতা ও সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা চলছে।’
শাহবাগে ঝটিকা মিছিল
শাহবাগ এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছে হিযবুত তাহরীরের সদস্যরা। হলুদ গেঞ্জি পরা হিযবুত তাহরীরের ২৫-৩০ জন সদস্য হঠাৎই শাহবাগ এলাকায় তাদের ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এসময় মোটরসাইকেল থেকে এক সদস্য মিছিলটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং পার হয়ে মিছিলটি পরীবাগের দিকে এগিয়ে যায়। মিছিল থেকে ‘হিযবুত তাহরীর জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়। এছাড়া মিছিলের সামনে একটি ব্যানারে ‘হিযবুত তাহরীরের নেতৃত্বে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হোন’ লেখা ছিল।
জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘এরকম একটি খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। আমরা ভিডিওর ছবি দেখে তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’