হাতিরঝিলে দিন-দুপুরে ছিনতাই

হাতিরঝিল থানারাজধানীর দর্শনীয় স্থান হাতিরঝিল এলাকায় থেমে নেই অপরাধীদের তৎপরতা। দিন-দুপুরে ঘটছে ছিনতাই, আর সন্ধ্যার পরে জমে ওঠে ইয়াবার বেচাকেনা। পুলিশ এই এলাকা থেকে প্রায় প্রতিদিনই ইয়াবা বিক্রেতা ও সেবী আটক  করলেও থেমে নেই ইয়াবা কারবারিদের তৎপরতা।

হাতিরঝিল থানা পুলিশ বলছে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই দুই-তিনজনকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে এদের বেশিরভাগই সেবনকারী ও ইয়াবা ফেরিওয়ালা।

স্থানীয়রা বলছে, চার-পাঁচ মাস আগেও হাতিরঝিল এলাকার চিত্র ছিল ভয়াবহ। মাদক বিক্রি ও ছিনতাইসহ দর্শনার্থীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির ঘটনা হরহামেশাই চলতো। তবে হাতিরঝিলে থানা প্রতিষ্ঠার পর অপরাধের ঘটনা অনেকটা কমে গেছে। তারপরও অপরাধীরা থেমে নেই। জানা গেছে, ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিরা বেশিরভাগই থানায় অভিযোগ করে না। আর, থানায় গেলেও ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি নথিভুক্ত না করে হারানো সংক্রান্ত জিডি নেয় পুলিশ।
গত ১২ নভেম্বর বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে হাতিরঝিলের পথ দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন রহমতুল্লা নাকে এক পথচারী। চারজন যুবক তার পথ রোধ করে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেয় দুটি মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ। এর আগের দিন অর্থাৎ ১১ নভেম্বর বিকালে রাজধানীর হাতিরঝিল থানার পশ্চিম রামপুরা এলাকা থেকে এক হাজার ৩৬০ পিস ইয়াবাসহ মাদক কারবারি আবুল হাসান (২২) ও রুবেল (২১)কে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৩।

গত ২১ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাতিরঝিল থানাধীন রামপুরা উলন রোডের থাই আবাসিক এলাকার ১ নম্বর গেটের সামনে থেকে ৮০ পিস ‘সাদা রঙের ইয়াবা’সহ মো. রাজিব মোল্লা (২২)কে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৩। এর আগে ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় হাতিরঝিলে ছিনতাইয়ের শিকার হন জাকির হোসেন ও মঈন। অস্ত্রের মুখে তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ও চারটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা।

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু মো. ফজলুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের থানায় প্রতিদিনই মাদকের মামলা হচ্ছে, আসামি গ্রেফতার হচ্ছে। তবে যারা গ্রেফতার হচ্ছে, তাদের কাছে বড়জোর ৪/৫ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। মূলত তারা ইয়াবা সেবনও করে আবার বিক্রিও করে থাকে। এছাড়া, বড় কোনও মাদক কারবারি এই এলাকায় নেই।’

ছিনতাই সম্পর্কে ওসি বলেন, ‘ছিনতাই আগে হতো, কিন্তু এখন অনেকাংশে কমে গেছে। তবে যারা ভুক্তভোগী তারা অনেকেই অভিযোগ করতে চান না। তারা হারানো জিডি করে চলে যান। কিন্তু ছিনতাই একটি অপরাধযোগ্য ঘটনা বিধায় মামলা হলে এটি তদন্তে গুরুত্ব পায়। কিন্তু ভুক্তভোগীরা মামলা করতে চান না।’

তিনি বলেন, হাতিরঝিলের প্রতিটি মোড়ে আমাদের পুলিশের টহল থাকে। ফলে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা নেই।’

ছিনতাইয়ের শিকার ভুক্তভোগী রহমতুল্লাহ পেশায় একজন সংবাদকর্মী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘গত ১২ নভেম্বর বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে হাতিরঝিলে বাস থেকে নেমে সড়কের পাশ দিয়ে হেটে কাওরান বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। এসময় চারজন যুবক আমাকে আগে-পিছে ঘিরে ফেলে। তাদের দুজনের হাতে ছুরি ও একজনের হাতে পিস্তল ছিল। তারা আমাকে হুমকি দেয়—  কথা বলবি না, এরপর আমার সঙ্গে থাকা দুটি স্মার্ট ফোন ছিনিয়ে নেয় এবং পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সব টাকা নিয়ে নেয়।’

তিনি আরও জানান,ঘটনার পর আমি হাতিরঝিল থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। কিন্তু থানা থেকে বলা হয়— ছিনতাইয়ের ঘটনায় কোনও জিডি হয় না, মামলা হয়। আপনি চাইলে মামলা করেন। আমি জিডি করতে চাইলে মোবাইল হারানো সংক্রান্ত একটি জিডি দায়ের করে পুলিশ।

এর দুদিন পর আমি জিডি সংক্রান্ত আপডেট জানতে থানায় যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে পুলিশ কিছুই বলতে পারেনি। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানোর পরে থানা পুলিশ ব্যবস্থা নিয়ে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। তবে আমার মোবাইল ফোন দুইটি এখনও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

এই ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা ও হাতিরঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অনাত মিত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ফারুক ও হারুন নামে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে আছে।

আরেক ভুক্তভোগী জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় তিন বন্ধু মিলে হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সির কাউন্টারের কিছু দূরে বেঞ্চে বসেছিলেন। তখন তিনটি মোটরসাইকেল আসে এবং তাদের ঘিরে ফেলে।অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জাকিরের সঙ্গে থাকা ২৬ হাজার এবং তার বন্ধুর কাছ থেকে চার হাজার টাকা এবং তিনজনের চারটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়। এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রেন জাকির।কিন্তু আজও  তাদের ছিনতাই হওয়া ফোনগুলো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় হাতিরঝিলের বাগিচারটেক ও মীরবাগ অংশে ইয়াবা সেবী ও ফেরিওয়ালারা ঘুরে বেড়ায়। এছাড়া, ইয়াবার কিছু ফেরিওয়ালা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়াবা বিক্রি করে থাকে। এদিকে, বিভিন্ন সময় মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারে করেও ছিনতাইকারীরা ঘুরে বেড়ায়। ফাঁকা জায়গা পেলেই তারা সাধারণের কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। তবে হাতিরঝিল থানা চালু হওয়ার পর থেকে এই এলাকার ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেই পালিয়ে থেকে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করছে।