মঙ্গলবার (২৯ জানুয়ারি) বাংলা ট্রিবিউন কার্যালয়ে আয়োজিত এ বৈঠকির সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক মুন্নী সাহা। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে এটিএন নিউজ।
বৈঠকিতে আলোচনায় অংশ নেন– আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কাবেরী গায়েন এবং বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ডাকসু। ৬০ দশকের ডাকসুর অনেকে এখন জাতীয় নেতা। দল-মতের পার্থক্য ভিন্ন কথা। এতোদিন নির্বাচন না হওয়ার নানা কারণ ছিলো। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকার যদি সিদ্ধান্ত না নিলে নির্বাচন হয় না। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা বলা যাবে। ৩৮ হাজার ছাত্রছাত্রী এক জায়গায় ভোট দেবে এটা সম্ভব নয়। হলে হলে ভোট হবে, সবাই ভোট দেবে।’
ডাকসু সবার– মন্তব্য করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমি চাই যেকোনও মূল্যে নির্বাচন হোক। এতে কে বিজয়ী হবে? সেটি বড় কথা নয়। একটা নতুন দিগন্তের সূচনা হচ্ছে ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এ ব্যাপারে ছাত্রদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সময়ে মত-পথের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সবাই ছিলাম বন্ধু। এখনও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিরাজ কাম্য। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সর্তক থাকতে হবে। নির্বাচন অবাধ ও নিরপক্ষ হবে না এটা আমি মনে করি না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে আমার ভালো লেগেছে। পরিবেশ সুন্দর রাখার জন্য সবার কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের উচিত, সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা। ছাত্রদল, ছাত্রলীগের মতপার্থক্য থাকলেও সামাজিকভাবে একসঙ্গে থাকবে এটা প্রত্যাশা করি। তর্ক-বির্তক না করে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আপন করে, তাদের মন জয় করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সংকটের সময় আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনগুলো নিজেদের নামে রাজনীতি করছে না। হয় সাধারণ ছাত্রদের ব্যানারে বা অন্য কোনও নামে মাঠে নামছে। নেতৃত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে থাকা উচিত। গত ২৮ বছরের দিকে তাকালে দেখি,রাজনীতি রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে চলে গেছে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ অন্যদের হাতে।’
ড. কাবেরী গায়েন বলেন, ‘ছাত্ররা এ নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করেছে, আইনি লড়াই করেছে। এটি কারও কোনও দয়ার বিষয় নয়। যখন সে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের বিরোধীরা হলে আসতে পারে না। এখন এটি সমাধানে আমাদের নজর দেওয়া উচিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে– ছাত্র সংগঠনগুলো লিফলেট বিলি বা অন্য কোনও কর্মসূচিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কিনা। আমরা চাই এ নির্বাচন যেন বির্তকিত না হয়। এজন্য সকল সমস্যা নির্বাচনের আগেই শেষে করতে হবে। নির্বাচন শেষ হয়ে যাবার পর হায় হায় করে কোনও লাভ নেই। ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের দাবিগুলো তুলুক, আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।’
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অতীতের সব ডাকসু নির্বাচন হলকেন্দ্রিক হয়েছে। হলভিত্তিক নির্বাচনে ভোট দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম আমরা। আজকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সংগঠনগুলো ওই রেওয়াজ ভাঙার কথা বলছে, তখন বুঝতে হবে কোনও না কোনও কারণ তৈরি হয়েছে। আস্থার জায়গা ঘাটতি তৈরি হয়েছে, বিশ্বাসের জায়গা নষ্ট হয়েছে, সাহসের জায়গা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বলেই আজকে এ দাবি তোলা হচ্ছে। আমি জহিরুল হক হলের ছাত্র, হলে যদি ভোট দিতে পারি তবে আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হবেন না। ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন ছাত্রলীগ প্রমাণ করুক, ১১ মার্চের আগে হল ও সংসদের পরিবেশ নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকট। এটি কখনও নেতায় নেতায়, কখন আঞ্চলিকতায়। দ্বন্দ্বে কোনও ভালো পরিবেশ তৈরি হয় না। ফলে অনেকে এখনও সন্দিহান– নির্বাচন আসলে হবে কিনা। যেকোনও কিছুর বিনিময়ে হোক ২৮ বছর পর যে সন্তান জন্ম নিতে যাচ্ছে, তাকে সুন্দর পরিবেশে জন্ম নিতে দেওয়া হোক। ডাকসু পাক নতুন ভিপি, জিএস; দেশবাসী পাক নতুন নেতৃত্ব।
তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ২৮ বছর যাবৎ হয়নি এটা ঠিক, কিন্তু তার আগে নিয়মিত হয়েছে তাও কিন্তু নয়। আদালতের রায়কে আমরা স্বাগত জানাই।’
সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আগের ডাকসু নির্বাচনের ভোট হয়েছে হলগুলোতে। ডান-বাম কখনও কখনও এক হয়ে যায় স্বার্থের কারণে। হল সংসদ নির্বাচন সাধারণ ছাত্রদের অধিকার। হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের আধিপত্য রয়েছে। সেক্ষেত্রে ছাত্রলীগ যদি জনপ্রিয় হয়, সেটি কি অপরাধ।
‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্তর্ভুক্ত আটটি সংগঠন ঐক্যবদ্ধ রয়েছে, যারা ডাকসু নির্বাচন, হল সংসদ নির্বাচন অবশ্যই হলকেন্দ্রিক হতে হবে এই দাবিতে। এটি নিয়ে মতদ্বৈধতার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করছি না। অধিকাংশ ছাত্র নেতা কী মনে করছেন তার চেয়ে বড় বিষয় অধিকাংশ শিক্ষার্থী কী মনে করছেন। আমি খোলাখুলি বলছি, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন যে দলেরই হোক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবো। ১০০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলবো, ১০ শতাংশ সমর্থনও যদি তারা পায়, তবে তাদের দাবি আমরা মেনে নেবো।’
আল মেহেদী তালুকদার আরও বলেন, ‘এতোদিন পরে ডাকসু নির্বাচন আলোর মুখ দেখছে। আমাদের কাছে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করবে কে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সহাবস্থানের নিশ্চয়তা পাইনি।’
লিটন নন্দী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষকে ক্ষমা চাওয়া উচিত, ২৯ বছর ধরে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করার জন্য। ডাকসু নির্বাচন সুবিধা নয়, অধিকার। এটি দয়ার বিষয় নয়।’
সহাবস্থান প্রসঙ্গে লিটন নন্দী বলেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কার্যকর সহাবস্থান হলগুলোতে নেই। গণরুমগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে রাজনীতির চর্চা করার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রচলিত সমাজের বাইরে নয়। অনেক সময় জাতীয় নেতারা দ্বিধাবিভক্ত থাকেন, তবে ছাত্ররা কিন্তু এক হন। একাডেমিক ভবনগুলোতে ভোট গ্রহণের কথা বলেছি, এতে ভয়মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হবে।’
ছবি: নাসিরুল হক