রাজউকের তথ্য মতে, হাজারীবাগে দেশের সবচেয়ে বড় ট্যানারি এলাকা হওয়া সত্বেও এতে কোনও ইটিপি বা সিইটিপি স্থাপনা করা হয়নি। যে কারণে ট্যানারিগুলো থেকে নির্গত দূষিত পানি ও রাসায়নিক বর্জ্য খোলা ড্রেনের মাধ্যমে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়তো। এর ফলে এলাকার মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত হয়ে পড়ে।
রাজউকের পরিসংখ্যান বলছে, হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে প্রতিদিন ৭৫ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য ও ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য কোনোরূপ পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি খোলা ড্রেন দিয়ে মাটি, পানি ও নদীতে গিয়ে পড়তো। এতে পুরো এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্যের সঙ্গে মাটিতে গিয়ে মেশা ক্রোমিয়াম ধাতু মাটি ও পরিবেশের জন্য একটি ধীরগতির বিষ। যা কখনো ধ্বংস হয় না বরং ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তর করা হলেও হাজারীবাগের মাটি ও পানিতে ক্রোমিয়াম থেকে গেছে। ফলে এর দ্বারা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ অবস্থায় জাপান ও সিঙ্গাপুরের আদলে হাজারীবাগ এলাকার ভূমির উন্নয়ন করতে চায় রাজউক। প্রকল্পের আওতায় হাজারীবাগের ৮ ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি অপসারণ করে বিশুদ্ধ মাটি দিয়ে ভরাট করা হবে। যাতে দূষিত মাটি নতুন প্রকল্প এলাকা ও ভূ-গর্ভস্থ পানির ক্ষতি করতে না পারে। এ জন্য এলাকার স্থানীয় ভূমি মালিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও আলাপ আলোচনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভূমি মালিকরা ইতিবাচক সড়াও দিয়েছেন।
হাজারীবাগের উন্নয়নের জন্য তিনটি পদ্ধতিকে বাচাই করেছে রাজউক। এগুলো হচ্ছে- ভূমি মালিক সমিতির নিজস্ব উদ্যোগ, ভূমি মালিক সমিতির সঙ্গে ডেভেলপার কোম্পানির চুক্তি ও ভূমি মালিক সমিতির সঙ্গে রাজউকের চুক্তি। ভূমি মালিকরা সম্মত হলে এ তিনটি পদ্ধতির যে কোনও একটির মাধ্যমে হাজারীবাগের উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ঋণ দাতা সংস্থা বা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করতে আগ্রহী রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
হাজারীবাগ রিডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অনুযায়ী রাজউক সবুজ প্রকৃতি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, মিশ্র ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায়। এর জন্য বর্তমানে থাকা ৮৭৪টি ভবনকে ভেঙে পুরো এলাকায় বহুতল ভবনসহ ৪০-৪৫টি আবাসিক ভবন নির্মাণ, মসজিদ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, ট্যানারি ক্লিনিক লাইব্রেরি, হাসপাতাল, কাঁচাবাজার, প্রাথমিক-মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং সেন্টার ও ক্লাব স্থাপন এবং খালের পাশ দিয়ে হাঁটার পথ ও পাবলিক স্পেস রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাজারীবাগের উন্নয়নের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সম্ভাব্য নকশা তৈরি করা হচ্ছে। এই সম্ভাব্য নকশায় বিশেষজ্ঞ ও ট্যানারি মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামতের প্রতিফলন থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভূমি মালিকরা বর্তমান সম্পত্তির সমমূল্যের আবাসিক বা বাণিজ্যিক স্পেস পাবেন। এছাড়া কমিউনিটি স্পেসগুলোর সমন্বিত মালিকানা ও ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে এসোসিয়েশন দ্বারা ব্যবস্থাপনা হস্তান্তর করা হব। পাশাপাশি বর্তমান বাজার মূল্যে সম্পত্তির বিদ্যমান মূল্য নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তার বহুল জনবসতিপূর্ণ এলাকা আরবান রিডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা ভূমি পুনঃউন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন করে সফল হয়েছে। আমরাও ঢাকার বোঝা হাজারীবাগকে একটি আধুনিক শহরে রূপান্তর করতে চাই। এ লক্ষ্যে হাজারীবাগ এলাকার দূষিত মাটি সাধারণ জনবসতি এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে। যাতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি না হয়।